রাজকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

চিত্র – দেবাশীষ বসু
বিঠ্ঠল, বা ভিঠ্ঠল বা পান্ডুরঙ্গা হচ্ছে মূলত বিষ্ণু বা তারই কৃষ্ণাবতার রূপ যার মন্দির বা পূজার প্রচলন প্রাচীন মরাঠা ও উত্তর কন্নড় প্রদেশে ছিল ও আছে। মহারাষ্ট্রের পন্ধারপুরে শ্রী ভিঠ্ঠলকে সমর্পিত একটি সুবিখ্যাত মন্দিরও আছে । তাকে ঘিরে মূলত: ভক্তি আশ্রয়ী গান এবং কথা প্রচলিত আছে, যাকে অভঙ বলা হয়। কবিশ্রেষ্ঠ, ভক্ত পুন্ডলিকের রচনা বিঠ্ঠল বা ভিঠোভা কে এক অনন্য, হৃদয়ের অন্তরের নিগূঢ়বাসী, মিত্ররূপী, ভক্তবৎসল, এক যেন রক্তমাংসের ঈশ্বরের রূপে স্থান দিইয়াছে। সে মন্দিরে শুধু মৃন্ময়ী মুরতিই নয়, সে যেন রচনার গুণে চিন্ময়ত্ব প্রাপ্ত হয়। তার কথা ও সুরে হৃদয়ের আকুতি এক অন্যমাত্রা নেয়।
সম্প্রতি আমি একটি অভঙ যুগলবন্দী শুনি, সুগায়কদ্বয় শ্রী মহেশ কালে ও শ্রী রাহুল দেশপান্ডের কন্ঠে। গানটির নাম ‘কনড়া রাজা পন্ধারিচা’ (कानडा राजा पंढरीचा) এবং সেটি মরাঠী ভাষায়। আমার সীমিত মরাঠী ভাষা বোধ, না জানারই সমান। গানটির বিঠ্ঠল-আকুতি বোধ, হয়ত বা গায়কদ্বয়ের পরিবেশনের গুণে, আমায় ভীষণ নাড়া দেয়। বেশ কয়েকবার শুনি। ভৌগোলিক স্থান-ভাষা-সংস্কৃতির উর্ধ্বে যে এক অসীম শান্তি ও ভালবাসার স্থিরাসন আছে, যা সর্ব ধর্ম, জাতির স্থুল চিন্তা ও তাত্ত্বিকতার উর্ধ্বে, তারই এক ব্যবহারিক দিক আমার অন্তরে উদ্ভাসিত হয়। কিছু ছন্দময় কথা মনে আসে এবং আমি লিখতে থাকি।
পরের দিন ভোররাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় তাড়াতাড়ি। আধো ঘুম, আধো জাগরণে চোখের সামনে কিছু দৃশ্যপট যেন ভেসে আসে। নিজেকেই যেন দেখি এক অন্য রূপে- এক গরিব ব্রাহ্মন, গৃহী পুরোহিতের রূপে। আমি যেন ভিঠ্ঠলের সেবায়েত। আমার বাহুলতাহীন কিন্তু পবিত্র সংসারী জীবন, ভিঠ্ঠলের অনুগ্রহে পরিচালিত। বোধহয় স্বপ্ন দেখছিলাম। লিখতে থাকি, ছন্দময়তার অভাব হয়না, হয়ত বা ভিঠ্ঠলের কৃপায়। সর্বত্রই সেই উষ্ম আবেশময় গুরুময়তাকে উপলব্ধি করি। ভগবদ্গীতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে আত্মার চিরবহমানতার কথা আছে, তা আমায় পুনঃ জাগরিত করে। এই কবিতা সেই গানের সুরমাধুর্য্যের আবেশেই, এবং বিঠ্ঠলের প্রতি অনুচ্চারিত প্রেমেই বেরিয়ে আসে।
অপূর্ব সে রাগ, অপূর্ব সে তান,
বিঠ্ঠলের তরে আর্তি শুনে
যেন জাগরিত হল মনের কোনায়
যুগ-ভেদী এ কোন গান?
বহু যুগের ওপার হতে
যেন আসে বিঠ্ঠলের বাণী,
এ তামসিক জীবনে হবে কি দূরিত
মোর সব কলঙ্কের গ্লানি?
মোর প্রাণ বাঁধে তান
সত্যেরই আলাপে,
লহমায় লহ প্রাণ
সত্যের অপলাপে।
অনেক জনম আগে তোমারই পূজারী
তখন দুরাচারের শাসনে।
ভীত-সন্ত্রস্ত আমি,
তবু আগলিয়া তব মুরতি
মম হৃদয় আসনে!
সব পুর নর-নারী দেখিল
তোমার বিগলিত, ঋজু মুরতি-
মন্দিরে মন্দিরে।
দেখিতে পেল না কেহ তোমায়
কর্ষিত মম ষটচক্রের
গিরি-কন্দরে।
জনগনের সৎসাহস হয় টলায়মান
শাসকের রক্তচক্ষু বাণে।
আমি জানি, তুমি তো রবে গোপনে
অন্তর্যামী স্বরূপে
মম স্থির প্রাণে।
শুভ্র পবিত্র সে জীবনে
ছিল না আড়ম্বর, না ছিল জটিলতা-
ছিল নিস্তরঙ্গ সংসার জীবনে
কেবলই তব পরশের আকুলতা।
কোনো দিন কি চেয়েছিলাম
সে জীবনে ক্ষমতাবান রাজা হতে,
যখন রাজরাজেশ্বর নিজেই
মম দেহ রথে, কুরুক্ষেত্রে
বসে নিজ আসন পেতে?
দুমুঠো অন্নসংস্থান দুবেলা
তুলে দিতে কি পারিনি গৃহিণীর হস্তে,
সন্তান ছিল না কি রসেবশে,
হয়েছে কি এ কারণে
জীবনে কোনদিন পস্তাতে?
যখনই হয়েছে সংসারে অভাব,
এসেছে মনেতে ভ্রকুটি,
কোথা হতে, পূজার থালা হাতে
হয়েছো নরনারী রূপে
মন্দির দ্বারে প্রকটি!
জানতে তুমি সত্যই, হে অন্তর্যামী
ক্ষুধা-তৃষার জ্বালা, বড় জ্বালা-
সাংসারিক জীবনে, সন্তানের ক্রন্দনে
চলেনা যে নিস্তরঙ্গ সাধনার পালা।
তাই তুমি আসিতে, মানুষের বেশে
সঙ্গে অন্ন-ফল-গুলালের ডালা।
নিজ পূজার তরে, নিজেরই সাধনে
এ কেমন হোলি খেলা?
কোথা গেল সে মুরতি
কোথা গেল সে আকুতি
ইহ নব্য জনমের তরে?
বিঠ্ঠলের বেশে
সেই সুর-বাণীর আবেশে
মোর শুষ্ক কুম্ভ কি ভরে?
যান্ত্রিকতায় নিমজ্জমান
এ জীবন বহিয়া যেত
শুষ্ক কেতাবি ঢঙ্গে,
পুরাণপুরুষের আলোকিত পরশে
এ গানই ভরে অন্তর,
আত্মার বহমানতার রঙে।