শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত

ভাইদাদা,
আজ একটু পরেই আমার বিয়ে। তুই সব সময় বলতিস, যেখানেই থাকি না কেন, তোর বিয়েতে ঠিক পৌঁছে যাবো পিঁড়ি ধরতে। ছোটবেলায় তোকে কী বিরক্তই না করতাম, মনে আছে? মোটা মোটা পড়ার বইগুলোতে ছবি এঁকে রাখতাম, হোমওয়ার্কের খাতায় হিজিবিজি কাটতাম, আর তুই মাকে নালিশ করলেই রাগ করে দাদুর ঘরে গিয়ে বসে থাকতাম। তুই যখন পেছন থেকে আমার চোখ টিপে ধরে নকল গলায় করে বলতিস, “বল তো আমি কে?”, আমিও দিব্যি না বোঝার ভান করে বলতাম, “কী জানি, চিনতে পারছি না তো!”
ভাইদাদা, মনে পড়ে, যেবার তোদের স্কুলে প্রথম প্রোজেক্টর লাগিয়ে সিনেমা দেখিয়েছিল? তুই আমাকে নিয়ে গিয়েছিলি। আমিও তোর সঙ্গে বাসে চেপে স্কুল যাচ্ছি ভেবে খুব নেচেছিলাম। তারপর ওই কষ্টের সিনেমা দেখে আমার সে কী কান্না! ব্যস, তোরও আর পুরোটা দেখা হলো না।
আরেকটা দিনের কথা খুব মনে পড়ে। আমি তখন সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছি, আর তুই বোর্ড পরীক্ষায় দারুণ নম্বর পেলি। চেয়ারে বসিয়ে পুরো স্কুল ঘোরানো হচ্ছে তোকে, আর আমি সবাইকে ডেকে ডেকে বলছি, “জানো, এটা আমার ভাইদাদা…”
তারপর যখন কলকাতা চলে গেলি পড়তে, কী মন খারাপ আমার! কেবল দিন গুনতাম কবে তুই আসবি, কলকাতার কেক আর টিনটিনের বই নিয়ে।
যেদিন মস্ত চাকরি পেলি মুম্বাইয়ে, সেদিন বাবা পাড়ার সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালেন। আমারই শুধু সবকিছু বিস্বাদ লাগছিল। তুই এত দূরে চলে যাবি? কেন যে আটকালাম না সেদিন তোকে!
সেই জন্মদিনটা কেউ কোনোদিন ভুলতে পারব না রে। সন্ধ্যাবেলায় ফোনে কত কথা হলো, তোকে মিস করছি কিনা, কে কে আসছে, কী রান্না হয়েছে, তোর কোন হোটেলে অফিস পার্টি আছে, আরও কত কী। আর… তার কয়েক ঘণ্টা পর… টিভি জুড়ে তোদের হোটেলের ছবি, গোলাগুলি, হামলা… কত রাত যে আমরা জেগে কাটিয়েছি, মা, বাবা, আমি… সারা রাত জানালার পাশে বসে ভেবেছি, এই বুঝি একটা গাড়ি এসে থামল, দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বলছিস, “হাঁ করে দেখছো কী, যা শুনেছ সব ভুল। আমি সেদিন ছিলামই না ওই পার্টিতে।”
এত বছর বিয়ের কথা ভাবতেই পারতাম না। শুধু মনে হতো, তুই তো এই বাড়িতেই আছিস, তোকে ছেড়ে কোথায় যাবো? তারপর তাপসের সঙ্গে আলাপ হলো। অনেকটা তোর মতোই স্বভাব। আর না করলাম না।
একটু পরেই বিয়ের আসর থেকে ডাক আসবে আমার। কেন রে ভাইদাদা, বারবার কেন মনে হচ্ছে, বাবা, মা, আমার, আমাদের সবার সেই কল্পনার গাড়িটা এক্ষুনি গেটের বাইরে এসে থামবে, আর কেউ পেছন থেকে আমার চোখ দুটো টিপে ধরে বলবে, “বল তো আমি কে?”… এবার চিনতে পেরেছি রে তোকে, তুই তো আমার ভাইদাদা, ঠিক মনে করে তোর বুড়ির বিয়ের পিঁড়িটা ধরতে এসেছিস।।
ইতি
বোনটি