সোমনাথ পাল

হায়দ্রাবাদ শহর বাহমনী রাজত্বের পরে ১৫১৮ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত চারশো তিরিশ বছর স্বাধীন মুসলিম শাসকদের রাজধানী ছিল বলে এখানে কুতবশাহী সুলতানদের ও আসফজাহী নিজামদের বিখ্যাত সমাধিস্থল আছে। তাছাড়া নিজাম রাজত্বের শাসনকালে মারাঠা আক্রমণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মুসী নদীর পাশ দিয়ে শহরের চারদিক তেরটি দরওয়াজা ও তেরটি খিড়কি দিয়ে ঘেরা ছিল। এখানে দুই সমাধিস্থলের সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও পুরাতন হায়দ্রাবাদের এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন পাঁচিলের দরওয়াজা ও খিড়কিগুলোর নাম জানাব।
প্রথমেই আমরা গোলকোন্ডা দুর্গের কাছে কুতবশাহী সুলতানদের সমাধিস্থল সম্বন্ধে আলোচনা করব। এক জায়গায় প্রায় সব শাসকদের সমাধি পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। প্রতিটি সমাধি তাদের স্থাপত্যের জন্য আমাদের নজর কাড়ে। সমাধিস্থলে ঢোকার পথেই প্রথমে ডানদিকে এক উঁচু চত্বরের উপরে ষষ্ঠ সুলতান আবদুল্লাহ কুতব শাহের বিশাল সমাধি দেখতে পাই। বিরাট গম্বুজের নীচে মাঝখানে সুলতানের সমাধি। অনেকেই জানেন না যে এই চত্বরের এক পাশে দিল্লির বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের নির্মিত প্রার্থনা করার জন্য ছোট্ট একটা মসজিদ আছে। এখানে থেকে আর একটু এগিয়ে গেলে পঞ্চম সুলতান মুহাম্মাদ কুতব শাহের সমাধি। এই সমাধির গম্বুজের বাইরের দিকটা অনেক রত্নখচিত ছিল। ব্রিটিশরা সব উপড়ে নিয়ে গেছে। আগে এই সমাধির দোতলায় ওঠা যেত।
একটু পিছনে এক সংগ্রহশালা আছে। সেখানে সুলতানদের কবরে নেওয়ার আগে শবদেহকে স্নান করানো হত। সেখান থেকে একটু এগিয়ে ডানদিকে দ্বিতীয় সুলতান জামশেদ কুলীর সমাধি। এর বিশেষত্ব হল এটা বাইরে থেকে দেখলে দোতলা মনে হলেও আসলে ভিতরে এটা একতলা। এরপরে আমরা সবথেকে বড় ও আকর্ষণীয়, পঞ্চম হায়দ্রাবাদ শহরের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান মুহাম্মাদ কুলী কুতব শাহের সমাধি দেখে অবাক হই। এটা সবথেকে রাজকীয় স্থাপত্য, এবং এর কারুকার্য দেখে মন আনন্দে ভরে যায়।
সমাধিস্থলের শেষ দিকে পাশাপাশি বাঁদিক থেকে প্রথম সুলতান সুলতান কুলী, তৃতীয় (বালক) সুলতান শোভন কুলী ও চতুর্থ সুলতান ইব্রাহিম কুলীর সমাধি দেখতে পাই।
এই তিনটা প্রায় একই ধাঁচের। ইব্রাহিম কুলীর নামে এই জায়গাটার নাম ইব্রাহিম বাগ। এগুলো ছাড়াও আরো বহু সমাধি এই চত্বরে আছে। ইদানীং আগা খান ট্রাস্টের সৌজন্যে এই সমাধিগুলোর সংস্কার করা হচ্ছে। আমি নিজে কুতবশাহী সমাধিস্থল অন্তত কুড়িবার দেখেছি।
এর পরে আমরা চারমিনারের পাশে মক্কা মসজিদের ভিতরে আসফজাহী নিজামদের এক বড় লম্বা হলঘরে পাশাপাশি চৌদ্দটি সমাধি দেখতে পাই। এখানে সমাধিস্থ আছেন—
- দিলওয়ার উন নিসা বেগম সাহিবা (নিজাম আফজল উদ দৌল্লাহর মা)
- নবাব মীর নিজাম আলী খান গুফরাণ মাব (দ্বিতীয় নিজাম)
- নবাব সিকন্দর জাহ মাগফিরত মন্জিল (তৃতীয় নিজাম)
- নবাব নাসির উদ দৌল্লাহ গুফরাণ মন্জিল (চতুর্থ নিজাম)
- নবাব আফজল উদ দৌল্লাহ মাগফিরত মকান (পঞ্চম নিজাম)
- নবাব মীর মাহবুব আলী খান গুফরাণ মকান (ষষ্ঠ নিজাম)
- উমদা বেগম সাহিবা (নিজাম আলী খানের মা)
- বক্সি বেগম সাহিবা (নিজাম আলী খানের সৎমা)
- খান বাহাদুর বেগম সাহিবা (নিজাম আলী খানের বোন)
- ইমামী বেগম সাহিবা (নিজাম আলী খানের মেয়ে)
- তাহনিয়াৎ উন্নিসা বেগম সাহিবা (নিজাম সিকন্দর জাহের মা)। এনার নামেই বর্তমান লালাগুডার নাম তাহনিয়ৎ নগর ছিল।
- চাঁদনী বেগম সাহিবা (নিজাম নাসির উদ দৌল্লাহর মা)
- বুরহানপুরী বেগম সাহিবা (নিজাম আলী খানের স্ত্রী)
- মিয়াঁ নেক রাজ (নিজাম আলী খানের বন্ধু)
আসফজাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা কামারুদ্দিন খানের সমাধি মহারাষ্ট্রের খুলদাবাদে এবং সপ্তম নিজাম ওসমান আলী খানের সমাধি হায়দ্রাবাদে কিং কোঠী প্রাসাদের উল্টো দিকে জুড়ি মসজিদে অবস্থিত।
আমি আসফজাহী সমাধিস্থল একবার দেখেছি।
এরপরে আসি প্রায় হারিয়ে যাওয়া পুরাতন হায়দ্রাবাদের পাঁচিলের সাথে পরিচয় করাতে। এই ১৮ ফুট উঁচু ও ৮ ফুট চওড়া পাঁচিল কুতবশাহী সুলতান আবুল হাসানের নির্দেশে মুবারিজ খান নির্মাণ শুরু করলেও প্রথম আসফ জাহ নিজাম উল মুল্ক কামারুদ্দিন খান কিছু দরজার উপরে প্যারাপেট তৈরি করে শেষ করেন। মুঘল বাদশাহ ফারুখশিয়ারের আমলে হায়দ্রাবাদ শহর ১৩টা দরওয়াজা ও ১৩টা খিড়কি সহ প্রায় সাড়ে নয় কিলোমিটার লম্বা এক পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল। পরে নিজাম আলী খানের সময়ে এই পাঁচিলের সংস্কার করা হয়। ১৯০৮ সালের মুসী নদীর ভয়ঙ্কর বন্যায় এই পাঁচিলের একটা বড় অংশ ভেঙে পড়ে। পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই পাঁচিল আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।


এই ১৩টা দরওয়াজাগুলো ছিল—
- চাদরঘাট দরওয়াজা
- দিল্লি দরওয়াজা
- আফজল দরওয়াজা
- চম্পা দরওয়াজা
- নয়াপুল দরওয়াজা
- দুধবাওলী দরওয়াজা
- ফতেহ দরওয়াজা
- আলিয়াবাদ দরওয়াজা
- লাল দরওয়াজা
- গৌলিপুরা দরওয়াজা
- মীর জুমলা দরওয়াজা
- ইয়াকুতপুরা দরওয়াজা
- দবীরপুরা দরওয়াজা
১৩টা খিড়কি ছিল—
- বুরহা খিড়কি
- মীর জুমলা খিড়কি
- মথা খিড়কি
- রঙলী শাহ খিড়কি
- বোডলা খিড়কি
- দারুসশিফা খিড়কি
- কালালা খিড়কি
- ধোবি খিড়কি
- হাসান আলী খিড়কি
- চম্পা খিড়কি
- চারমহল খিড়কি
- দুধবাওলী খিড়কি
- কাহার খিড়কি
আমি দবীরপুরা দরওয়াজা সাত-আটবার দেখেছি।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার—
ল্যান্ডমার্কস অফ হায়দ্রাবাদ — সৈয়দ আলী আসগর বিলগ্রামি
হায়দ্রাবাদ ফোর হান্ড্রেড ইয়ার্স — রাজা আলী খান
ভ্রমণ কাহিনী — জাঁ ব্যাপটিস্ট টেভার্ণীয়ার
ডেকান আর্কাইভ
উইকিপিডিয়া
অন্তর্জাল