Menu

Jadavpur University Alumni Association Hyderabad Chapter

(JUAAH)

Blog Search

ঘটি-বাঙালের ফুটবল যুদ্ধ

রাজকুমার ব্যানার্জী

একটা কবিতা এল

‘১৬-০৮-১৯৮০’, এই প্রসঙ্গে!

মানুষ সে সময় বুঝেছিল এ বঙ্গে,

বাঙাল-ঘটির যুদ্ধের রঙ্গে,

অযথা কয়েকটি তাজা প্রাণ চিরতরে

ঝরে পড়ে এক সঙ্গে।

 

এ কবিতা আসল ঘটনা থেকে প্রভাবিত, কিছুটা কবির কল্পনা ও কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিল তখনকার খবরের কাগজের রিপোর্টারদের সেই হতভাগ্য সদ্য সন্তানহারা বাপ-মায়েদের বিবরণী থেকে।

কবিতার পুঙ্খানুপুঙ্খ সত্যতা যাচাই করার থেকে কবিতার নির্মম, অন্তর্নিহিত বঙ্গদেশের সামাজিক বিবিধতার মধ্যে যে একতা— সেইটাকে প্রাধান্য দিলেই এই কবিতা লেখার যথার্থতা প্রমাণ পাবে।

 

(ইডেন উদ্যানে বলি ফুটবল-নিবেদিত আত্মাদের স্মরণে)

১৬ই আগস্ট

 

ন’ বছর আমার বয়স তখন

ইষ্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের পাঞ্জা চলে সর্বক্ষণ।

পাড়ায় পাড়ায় দুই প্রাণের বন্ধুর

লড়াইও হতো যখন-তখন।

তাদের সাথে আমরা ও

গলা ফাটাতাম প্রাণপণ।

 

ফুটবল যুদ্ধের দিন দুজনাই গেল ময়দানে,

তাদের নিজেদের নিজেদের

সাঙ্গ-পাঙ্গ সনে, বাসে-ট্রেনে,

গাল রাঙিয়ে আবিরের রঙ্গে

লাল-হলুদ বা সবুজ-মেরুণে।

 

তখন দুই অভিন্ন হৃদয়,

যাদের জীবন ছিল প্রায়ই

নানা পদের ইলিশ বা চিংড়িময়।

সে দিন না জানি কিসের জিঘাংসায়

করিল না মনের রসনার সে বিনিময়।

ভাবিল দুজনেই, দরকার কি এই সময়?

করলে, যদি দিন হয় অপয়া!

সেই দুঃখে, অলক্ষ্যে হাসিল,

নাকি কাঁদিল বিধাতা সর্বময়?

 

ইডেন-উদ্যানের বৃহৎ আঙিনা

ভিড়ের ঠেলায় লাগে ছোট্ট একচালা।

সমান তেজে দুই পক্ষই

তারস্বরে ফাটাচ্ছে তাদের গলা—

একে অন্যকে ছুঁড়ছে অশ্রাব্য ভাষার ঢেলা,

বাপের চোদ্দ পুরুষ উদ্ধারের সেই ভাষা,

মুখে যা কিছুতেই যায় না বলা।

 

মা-বাবা সম, শ্রদ্ধেয় মাসি-মেশোমশাই,

সম্মান তাদের ওঠে পাকিয়ে

এক-একটি কদর্যতার দলা!!

 

যুযুধান ফুটবলের লড়াই,

এ যে বাঙাল-ঘটির

মূল্যহীন অহংকারের দলাই-মালাই।

হেরে গেলে যদি বিপক্ষের খোঁটায়

মন বলে ‘পালাই পালাই’!

‘বালাই ষাট! একি ভাবছি?

এ যে আমার নিজের বাঁচার লড়াই’!!

 

সমান তালে চলে ফুটবল যুদ্ধ,

এক পক্ষের চিৎকার তো

অন্যপক্ষ বাকরুদ্ধ।

পাশা খেলার অভিনব সংস্করণ

কখন যে হয় বিপক্ষের বস্ত্রহরণ।

 

উত্তেজনার পারদে নিয়মের

দিয়া বলি ক্ষণিকের তরে,

মারামারি, হাতাহাতি দুই

প্রতিদ্বন্দ্বীর, মাঠের ভিতরে।

বাইরে, গ্যালারিতে ঢিল-পাটকেল,

যেন পাগলা হাতি রণক্ষেত্রে।

 

গ্যালারিতে যুযুধান দুই পক্ষ

করে উন্মত্তবৎ হাতাহাতি।

দেখে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে আসে

পুলিশ, শুরু হয় নির্বিচার লাঠি।

 

শুরু হয় প্রাণভয়ে দিগ্বিহীন দৌড়,

পড়ে থাকে অভাগা কিছু নবীন-প্রৌঢ়।

হঠাৎ সম্বিত ফেরে, শোনে বন্ধুর

রক্তজল করা আর্তনাদ,

পিছন ফিরে তাকাতেই, ভেসে ওঠে

মাসিমার মুখ আর তার স্নেহভরা আশীর্বাদ।

 

সব ভুলে দৌড়ে যায়, দু বাহু বাড়ায়ে

তুলতে যায় টেনে সর্বশক্তি দিয়ে—

বিরুদ্ধপক্ষ চিনে নেয় তারে আবিরের রঙে,

‘মারতে এসেছে শালা, মেরে ফেল প্রাণে!!’

 

নিষ্পাপ আবিরের গুণে, চিনে নিয়ে রঙ,

পায় নিদারুণ আঘাত মাথায়-বুকে বেদম!

দুই বন্ধুই পড়ে রয় ‘স্বর্গোদ্যানে’,

আবিরের রঙ এক হয় রক্ত-স্নানে।

 

জীবন-মরণের সীমানা ছাড়িয়ে—

দুই বন্ধুর হয় আবার দেখা,

ভৌগোলিক ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে

অভিন্ন দুই আত্মার মিলনে।

Go Back



Comment

Protected by Mathcha