Menu

Jadavpur University Alumni Association Hyderabad Chapter

(JUAAH)

Blog Search

দিঘিডাঙ্গার গল্প

দেবাশিস বসু

বেশ কিছু বছর আগে ‘শান্তিনিকেতন আর্টিসন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ নামের এনজিওটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চন্দনাদি— যিনি এখন আর আমাদের মধ্যে নেই। গ্রামে গ্রামে বাচ্চাদের পড়াশোনা শেখানো, বছরের বিভিন্ন সময় তাদের জামাকাপড়, বইখাতা দেওয়া, খেলাধুলো করানো, মেয়েদের হাতের কাজ শিখিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা ইত্যাদি ছিল নিয়মিত কাজ। এনজিওর পোশাকি নাম দেওয়া হলো ‘মার্জিন টু মেইনস্ট্রিম’— যে নামে আজ সবাই চেনে। চন্দনাদি গ্রামের এই বাচ্চাদের খুব প্রিয় ছিলেন। বছরের বেশ খানিকটা সময় উনি শান্তিনিকেতনে কাটাতেন, কারণ এনজিওর বেশির ভাগ কাজ বোলপুর আর তার আশেপাশের গ্রামে হতো।

আজ থেকে বছর ছয়-সাত আগে আমি ও আমার স্ত্রী মন্দিরা এই এনজিওর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি, কারণ সমাজের এই শ্রেণির লোকজনের জন্য কিছু করার ইচ্ছে আমাদের মধ্যে বরাবরই ছিল। আস্তে আস্তে আমরা এই কাজের মধ্যে জড়িয়ে পড়ি এবং চন্দনাদির আস্থাভাজন হই। যে গ্রামগুলোয় আমরা কাজ করি, সেগুলো বেশিরভাগই আদিবাসী গ্রাম। অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত ভাবে তারা অন্যান্য সাধারণ গ্রামের থেকে অনেকটা পিছিয়ে। গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে পড়াশোনার মান অনেকটাই নিম্নমানের। গ্রামে খেলাধুলোর ব্যবস্থা নেই। বাচ্চাদের শেখার সুযোগ কম। ওদের বাবা-মারা বেশিরভাগই মাঠে চাষের কাজ করে, তাদের মধ্যে বাচ্চাদের শিক্ষিত করে তোলার উৎসাহ কম।

আমরা এখন পর্যন্ত ৮টি সাঁওতাল গ্রামে পড়াশোনার ব্যবস্থা চালু করেছি। আদিবাসী যুবক-যুবতীদের মধ্যে যারা মোটামুটি শিক্ষিত, তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ করেছি। সপ্তাহে তিন-চার দিন এরা বাচ্চাদের পড়ায়। ছাত্র-ছাত্রীরা প্রায় সকলেই প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী অবধি পড়ে, যদিও অনেকেই এখনও নিজেদের নাম লিখতে পারে না অথবা বইয়ের লেখা ঠিকঠাক পড়তে পারে না। আমাদের নিযুক্ত করা শিক্ষকদের মাধ্যমে এই বাচ্চাদের পড়াশোনার মান উন্নত করার চেষ্টা করা হয়— যদিও কাজটা খুবই কঠিন। আমরা আদিবাসী সমাজের একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক খুঁজে পেয়েছি এবং তার তত্ত্বাবধানেই বাচ্চারা পড়াশোনা করে। মনে হয় ওনার চেষ্টার কিছু ফল নিশ্চয় পাওয়া যাবে।

বোলপুরের থেকে একটু দূরের গ্রামগুলো আয়তনে ছোট এবং সুযোগ-সুবিধে কম। বাচ্চাদের খেলা-ধুলোর ব্যবস্থার অভাব লক্ষ্য করে আমরা তাদের জন্য ছোট ছোট পার্ক তৈরি করে দিলাম। দোলনা, ঢেঁকি, মাংকি বার ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হলো। পার্ক তৈরি হওয়ার পর তার উদ্বোধন পর্ব। বাচ্চাদের আনন্দ আর ধরে না। আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া প্রিয় মানুষদের নামেই পার্কগুলোর নামকরণ হয়েছে। চন্দনাদির নামেও একটা পার্ক আছে। পার্কগুলো নিয়ে বাচ্চাদের উৎসাহ দেখে খুব ভালো লাগে। আমাদের শিক্ষকরাই পার্কের দেখাশোনা করেন। বাচ্চারা সেখানে খেলাধুলোর পাশাপাশি পার্কগুলো পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও খুশি মনেই পালন করে। ফুলের গাছ লাগায় আর তার যত্নও করে। এখন পর্যন্ত আমরা ছ’টা গ্রামে পার্ক তৈরি করেছি। সুযোগ পেলে আরও কিছু ছোটদের পার্ক তৈরি করার ইচ্ছে আমাদের আছে।

এমনই একটি গ্রামের নাম দিঘিডাঙ্গা, সেখানে বাচ্চাদের পড়ানো হয়, আবার তাদের খেলার পার্কও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। আমরা একদিন দিঘিডাঙ্গার বাচ্চাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাচ্ছিলাম। আমরা যখনই যাই, ওদের জন্য বিস্কুট আর চকোলেট ইত্যাদি নিয়ে যাই। বাচ্চারা লাইন করে দাঁড়িয়ে নেয় আর খুব আনন্দ করে খায়। তার মধ্যে একটি ছেলে, তার নাম মহাদেব, বলল, “তোমরা একটু দাঁড়াও, আমি আসছি।” বলেই সে এক ছুট্টে চলে গেল। আমরা ওর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলো। হাতে দুটো তাল। আমাদের হাতে দিয়ে বলল, “এই দুটো আমাদের গাছের, তোমাদের জন্য এনেছি।” আশেপাশের বাচ্চারা হাততালি দিয়ে উঠল। এত কষ্টের জীবন যাপন করেও ওদের মনের সৌন্দর্য আর সারল্য আমাদের খুব ভালো লেগেছিল। কিছুটা অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।

ভাবছিলাম সুযোগ পেলে ওরা হয়তো আমাদের মতো অথবা আরও উন্নত হতে পারত। আমাদের চেষ্টা যৎসামান্য, এদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনা মনে হয় প্রায় দুঃসাধ্য। তবে চেষ্টা চলতে থাকুক।

Go Back

Comment

Protected by Mathcha