Menu

Jadavpur University Alumni Association Hyderabad Chapter

(JUAAH)

Blog Search

বাংলা রসসাহিত্য

ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তী

ব্রহ্মার মুখ নিঃসৃত যে চারটি বেদ সৃষ্টি হয়েছিল, তাদের মধ্যে ঋগবেদ থেকে এল কথা, সামবেদ থেকে এল সঙ্গীত, যজুর্বেদ থেকে এল অভিনয়, আর অথর্ববেদ থেকে এল রস।

এছাড়া আর একটি বেদের উল্লেখ শাস্ত্রে পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় পঞ্চম বেদ— ইতিহাসপুরাণং পঞ্চমংবেদম্‌।

এই ধারণা মতে ইতিহাস এবং পুরাণকথাকে পঞ্চম বেদ হিসেবে গণ্য করা হয়। সেক্ষেত্রে মহাভারত এবং, কোন কোন মতে, উপনিষদও পঞ্চম বেদ হিসেবে মান্যতা পেয়ে থাকে।

প্রাচীন ভারতীয় ঋষি ও নাট্যবিশারদ ভরত মুনি ব্রহ্মার নির্দেশে চতুর্বেদের সরলীকরণ করে যে নাট্যশাস্ত্রটি রচনা করেন, তাতে আটটি রসের কথা আছে— শৃঙ্গার, বীর, করুণ, অদ্ভুত, হাস্য, ভয়ানক, বীভৎস, রৌদ্র।

পরে কালের প্রবাহে “শান্ত” রসটি সংস্কৃত সাহিত্যে প্রবেশ করে।

যাই হোক, এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যের “হাস্য” রস নিয়ে এই রসাত্মক আলোচনাটিকে একটু গুরুগম্ভীর করার জন্য নান্দীমুখটাতে একটু পাণ্ডিত্য ফলাতে গিয়ে পাঠকের দরবারে যে একটু হাস্যস্পদ হলাম, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

এবার বাংলা সাহিত্যের হাস্যরস-সমুদ্রে অবগাহন করা যাক।

যুগ যুগ ধরে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে হাস্যরসের ধারার জোয়ারে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।

একের পর এক রথী-মহারথী বাঙালি সাহিত্যসেবকরা বাংলা হাস্যরস-সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন এবং এখনও করে চলেছেন।

তাঁদের সৃষ্ট হাস্যরস-সাহিত্যের অম্লমধুর স্বাদ গ্রহণ করে বাঙালি পাঠকসমাজ যে নির্মল আনন্দ লাভ করে আহ্লাদিত হন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এই নির্মল আনন্দ প্রসঙ্গে একটা কথা এখানে বলে নেওয়া দরকার যে, বাংলা হাস্যরস-সাহিত্যকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়— নির্মল হাস্যরস (Humour), ব্যঙ্গ (Satire), কৌতুক (Fun) এবং শ্লেষাত্মক (Wit)।

ইংরেজি সাহিত্য আরও দুটি হাস্যরসধারার সন্ধান দিয়েছে, যেমন— Pun এবং Nonsense।

ইদানীং কালে আবার মানুষ সাহিত্যের বাইরে performing art-এর জগতে আরও একটি হাস্যরস আস্বাদন করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, যেটা সাহিত্য জগতে Dark Humour নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। আবার performing art-এর ক্ষেত্রে এই Dark Humour-ই Roasting নামে আধুনিক যুগে মান্যতা পেয়েছে।

তবে এই Dark Humour আর Roasting— এই দুই ক্ষেত্রেই আমার কেমন যেন মনে হয়, যেন মানুষের অন্তরের ভেতর বসবাসকারী জান্তব প্রবৃত্তিটা তার নখ-দাঁত নিয়ে সর্বসমক্ষে হাজির হয়ে দন্তকৌমুদি বিকশিত করে শয়তানি তৃপ্তি লাভ করে থাকে।

আমার ব্যক্তিগত মতামত অনুযায়ী, সাহিত্যজগতের হাস্যরসের পঞ্চব্যঞ্জনের মধ্যে নির্মল হাস্যরস এক কথায় অনবদ্য।

এই রস পাঠককে যে পরিমাণ আনন্দ দান করে, তার ভালো লাগার মাত্রা সর্বাধিক।

বাংলা হাস্যরস-সাহিত্যের আনন্দযজ্ঞে যে সকল হাস্যরস-সাহিত্যসেবকগণ পাঠকসমাজকে যুগ যুগ ধরে নির্মল আনন্দ দান করে গেছেন, তাঁদের মধ্যে তারাপদ রায়ের নাম অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।

তাঁর তৈরি নির্মল আনন্দের ছোট্ট একটি ব্যঞ্জন এখানে পরিবেশন করছি।

মেঘনাদবাবুকে লেখা তারাপদবাবুর চিঠি:

“প্রিয় মেঘনাদবাবু,

গত শনিবার রাতে খুব বৃষ্টির সময় আমার বাড়ি থেকে ফিরে যাবার জন্যে আমাদের চাকর পাশের বাড়ি থেকে যে ছাতাটি আপনাকে এনে দিয়েছিল, সেই ছাতাটি পাশের বাড়ির ভদ্রলোক আজ চাইতে এসেছিলেন।

ভদ্রলোক বললেন, ছাতাটি তিনি তাঁর অফিসের বড়বাবুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এসেছিলেন। বড়বাবুকে বড়বাবুর ভায়রাভাই খুব চাপ দিচ্ছেন ছাতাটির জন্য, কারণ বড়বাবুর ভায়রাভাই যে বন্ধুর কাছ থেকে ছাতাটি আনেন, সেই বন্ধুর মামা তাঁর ছাতাটি ফেরত চাইছেন।

শুনলাম, ছাতাটি নাকি মামাবাবুরও নিজের নয়, তাঁর শ্বশুরের।

ইতি

তারাপদ রায়”

এই চিঠিটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং এর স্বপক্ষে কোনো রকম ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

তারাপদ রায়ের লেখা এই চিঠিটি পড়বার পর আমার মাথায় দুষ্টু সরস্বতী ভর করেন।

আমি মেঘনাদবাবুর হয়ে একটি চিঠি লিখে তারাপদবাবুকে পাঠাই।

মেঘনাদবাবুর লেখা এই চিঠিটি পাঠকদের নির্মল আনন্দ দিতে পারবে কিনা, সেটার উত্তর কিন্তু আমার কাছে নেই।

মাননীয় তারাপদবাবু,

প্রথমেই আপনার পত্রের প্রাপ্তি স্বীকার করি এবং আপনাকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

সেই শ্রাবণ মাসের সারমেয়-মার্জার বারি বর্ষণ রাতে আমাকে শুষ্ক অবস্থায় বাড়ি পৌঁছাতে আপনার ছাতাটির অবদান ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

বাংলার প্রবচন বলে— শীতের কাঁথা আর বর্ষার ছাতা হাতছাড়া করিতে নাই।

এই প্রবচনগুলো আমাদের পূর্বপুরুষেরা কত যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর প্রচলন করেছিলেন, সেটা আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি।

যাই হোক, পরের দিনই সকালে আমি আপনার ছাতাসহ আপিসযাত্রা করেছিলাম।

ইচ্ছে ছিল আপিস ফেরতা আপনার বাড়িতে ছাতাটি ফেরত দিয়ে বৈকালিক চা-পান পর্বটি আপনার বাড়িতেই সেরে আসব।

আপনার রাধুনির গরম ফুলুরি আর আপনার পছন্দের দার্জিলিং চা— দুটোই, যাকে বলে, স্বাদে এবং গন্ধে অতুলনীয়।

এবার মূল বিষয়ে ফিরে আসি।

আপিস যাবার সময় আমি অনবধানতাবশত ২৬ নং ট্রামগাড়িতে আপনার ছাতাটি ফেলে যাই।

পরের দিন আবার আপিস যাবার সময় ছাতাটার কথা মনে পড়ে। সেই দিন আপিস ফেরতা আমি ২৬ নং ট্রাম গুমটিতে আপনার ছাতাটির খোঁজ করতে যাই।

ট্রামগুমটির বড়বাবু ছাতা প্রাপ্তির কথা অস্বীকার করেননি।

তিনি স্বীকার করেন যে গতকাল সকালেই ২৬ নং ট্রামগাড়ির ড্রাইভার তিওয়ারিজি আমার ফেলে আসা ছাতাটি ট্রাম কোম্পানির লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড গুদামে জমা করে দিয়ে গেছেন।

কিন্তু দুপুরে গুদামবাবু তাঁর শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাওয়ার সময় আকাশে ঘনঘোর মেঘের সম্ভার দেখে আপনার ছাতাটি সঙ্গে নিয়ে যান।

অতঃপর মধ্যাহ্ন ভুরিভোজ পর্বের পর, সেই দিন বিকেলে গুদামবাবুর শ্যালক পাড়ার বলখেলার মাঠে একটি আমন্ত্রণমূলক ফুটবল প্রতিযোগিতা দেখতে যাবার সময় আপনার ছাতাটি সঙ্গে নিয়ে যান।

সেই খেলায় স্থানীয় দলের বিরুদ্ধে রেফারির একটি পেনাল্টি সিদ্ধান্ত মাঠে তুমুল হট্টগোলের সৃষ্টি করে।

সেই হট্টগোলে এক অজ্ঞাতপরিচয় দর্শক আপনার ছাতাটি গুদামবাবুর শ্যালকের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সেটি রেফারির মাথায় ইস্তেমাল করেন।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, রেফারির মাথায় ছাতাটি ব্যবহারকালে ছাতাটি তৎক্ষণাৎ দেহ রাখে।

এই কারণে, গুদামবাবু আজ সকালে ছত্রহীন অবস্থায় দপ্তরে এসে পুরো ঘটনার একটি লিখিত বিবরণ জমা করেছেন এবং সর্বশেষে তিনি একটি দাবি করেছেন যে আসলে আপনার ছাতাটির মান খারাপ ছিল, নাকি রেফারির মাথাটি নিরেট— এই বিষয়টি তদন্ত করে দেখার পরই যেন ট্রাম কোম্পানি তাঁর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের মূল্য নির্ধারণ করে।

সেই লিখিত বিবরণ অনুযায়ী ট্রাম কোম্পানি এখন একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে।

অনুসন্ধান কমিটি আপনার ভাঙা ছাতাটির গুণমান খতিয়ে দেখে তাদের রিপোর্ট জমা দেবে।

ট্রাম কোম্পানি আমাকে অনুরোধ করেছে যে, যতদিন না তাদের অনুসন্ধান কমিটির রিপোর্ট জমা পড়ে, ততদিন যেন আমি একটু ধীরজ রাখি।

পরিশেষে, আমিও আপনাকে কিছুকাল অপেক্ষা করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।

আপনিও আপনার পাশের বাড়ির ভদ্রলোককে ওনার আপিসের বড়বাবুর ছাতা-সংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাম কোম্পানির অনুসন্ধান কমিটি গঠনের বিষয়টি জানিয়ে দেবেন।

আশা করি, শেষপর্যন্ত আপনার পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের আপিসের বড়বাবু মারফত ওনার ভায়রাভাইয়ের বন্ধুর মামার শ্বশুরের কাছে ওনার ছাতার বর্তমান হাল-হকিকতের বিবরণ পৌঁছে যাবে।

সর্বশেষে জানাই যে, এই অনিবার্য পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার দরুন আপনার মানসিক অবস্থার কথা অনুমান করে আমি যারপরনাই লজ্জিত এবং অত্যন্ত দুঃখিত।

নমস্কারান্তে,

ইতি,

শ্রীমেঘনাদ দশানন রায়

পুনশ্চ: এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, ট্রাম কোম্পানি এই অনুসন্ধান চলাকালীন আপনাকে, আপনার পাশের বাড়ির ভদ্রলোককে এবং তাঁর ভায়রাভাই ও তাঁর বন্ধু এবং তাঁর মামা, এমনকি মামার শ্বশুরকেও পুছতাজের জন্য সমন পাঠাবে।

ট্রাম কোম্পানি আশা রাখে, আপনাদের তরফ থেকে আন্তরিক সহযোগিতার কোনো কমতি হবে না।

শুধু আপনি আপনার পাশের বাড়ির ভদ্রলোককে জানিয়ে দেবেন যে, উনি যেন ওনার আপিসের বড়বাবু মারফত বড়বাবুর ভায়রাভাইয়ের বন্ধুর মামার শ্বশুরকে জানিয়ে দেন যে সাক্ষ্যদানকালে উনি যেন ওনার ছাতার ক্যাশ মেমোটি সঙ্গে আনেন, কেননা ছাতাটির বয়স নির্ধারণ উপলক্ষে ক্যাশ মেমোটি খুবই জরুরি।

Go Back

Comment

Protected by Mathcha