Menu

Jadavpur University Alumni Association Hyderabad Chapter

(JUAAH)

Blog Search

বাস্তব - অবাস্তব

মাধব চট্টোপাধ্যায়

জীবনটা একটা সংগ্রামক্ষেত্র। যুদ্ধক্ষেত্রে অলস কল্পনা-বিলাসীদের কোনও ভূমিকা থাকতে পারে না। তাই একদল হিসেবী মানুষ যাবতীয় অবাস্তব ধ্যান-ধারণার কঠোর বিরোধী। তাঁদের বিশ্বাস ভূত-পেত্নী, পক্ষীরাজ ঘোড়া, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীদের নিয়ে বানানো যাবতীয় রূপকথার গল্প শিশুদের পক্ষে ক্ষতিকর। কারণ এসব উদ্ভট কাহিনি শুনে বা পড়ে তারা বাস্তব-বিমুখ, কল্পলোকবাসী এবং জীবন-সংগ্রামের অনুপযুক্ত হয়ে বেড়ে ওঠে। বড়দিনের আগের রাত্তিরে “সান্তা ক্লজের” রেখে যাওয়া উপহার, তাঁদের মতে, একটা মস্ত বড়ো ধাপ্পা, যা শিশুদের মানসিকতার পক্ষে ক্ষতিকর। যেসব পূর্বপুরুষ বহুদিন আগে মারা গেছেন, তাঁদের উদ্দেশে মহালয়ার দিন জলদান করা বা হেমন্তকালে আকাশ-প্রদীপ দেওয়া, তাঁদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের ছেলেমানুষী খেলা— অর্থ এবং সময়ের অপব্যয়।

এঁদের একটা বড়ো অংশ আবার এ ব্যাপারে দ্বৈত-মানসিকতা পোষণ করেন। ছেলেমেয়ে ঠাকুরমার ঝুলি পড়বে— এতে তাঁদের ভীষণ আপত্তি, অথচ তাদের হ্যারি পটার পড়তে দেখলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুগোপযোগী হয়ে উঠছে ভেবে তাঁরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে ওঠেন। অবাস্তব কাহিনিও তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, যদি সেটা কোনো শ্বেতাঙ্গ লেখকের কলম থেকে বেরোয়। সন্দেহ নেই, প্রায় দুশো বছর শ্বেতাঙ্গ শাসন এদেশের কিছু জনসাধারণের মনে স্থায়ী বংশানুক্রমিক প্রভাব রেখে গেছে। রবীন্দ্রনাথ-কথিত কর্তার ভূত এখনও ঘুরে বেড়ায় এদেশের আনাচে-কানাচে।

যে রূপকথা নিয়ে তাঁদের এত আপত্তি, সেই কাহিনির ইতিবাচক দিকগুলি তাঁদের অতিসূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধিতে ধরা দেয় না। অনেক রূপকথায় দেখা যায়, শুধু রাক্ষস-খোক্কস নয়, নিষ্ঠুর-স্বভাব রাজামশাই, যিনি অকারণেই জঙ্গলে ঢুকে যথেচ্ছভাবে পশুহত্যা করেন শুধু শিকারের আনন্দ উপভোগ করার জন্যে, বা ঈর্ষাপরায়ণ রানি, যিনি রাজামশাইয়ের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সতীনের ওপর অত্যাচার করেন— এঁদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত শাস্তি পেতে হয়। এইভাবেই এইসব কাহিনি শিশুদের কোমল মনে মূল্যবোধের বীজ ছড়িয়ে দেয়। বন্দিনী রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে বেরিয়ে যখন রাজপুত্র দেখে একটা পিঁপড়ে জলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে বা ফাঁদে পড়ে ছটফট করছে কোনো পাখি, সে তাদের প্রাণ বাঁচায়। সংকট মুহূর্তে এরা আবার রাজপুত্রকে সাহায্য করতে হাজির হয়। এইভাবেই, শিশুরা জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়ে যায় রূপকথা থেকে— গাছপালা, জন্তু-জানোয়ার নিয়ে আমাদের যে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, সেটা রক্ষা করলে পরিবেশ আমাদের নানারকমভাবে সাহায্য করে।

একটি গল্পে দেখি এক বোকা বামুন আর এক বোকা তাঁতি, দারিদ্র্য-মোচনের জন্যে তপস্যা করে লক্ষ্মী-নারায়ণের দেখা পায়। তাঁরা কিন্তু তাদের সরাসরি ধন-দৌলত না দিয়ে একটি বড়ো পাখির পিঠে চড়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ করে দেন। এখানে-ওখানে ঘুরতে ঘুরতে ঘটনাচক্রে তারা বিপুল ঐশ্বর্য লাভ করে দেশে ফেরে। এই কাহিনি শিশুদের বুঝতে শেখায়, জীবনটা অনেক বড়ো এবং ভাগ্য ফেরাবার সুযোগ ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবী জুড়েই। রূপকথায় বর্ণিত জিনিসের কোনটা বাস্তব আর কোনটা অবাস্তব, সেটা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই জেনে যায়। রূপকথা সে ব্যাপারে কোনো প্রতিবন্ধক হয় না।

জীবনটাকে সর্বাঙ্গসুন্দর করতে হলে কিছু কল্পনাকে সচেতনভাবে প্রশ্রয় দিতে হয়। কেউ বিশ্বাস করে না, মহালয়ার দিন আমাদের পরিচিত এবং অপরিচিত প্রয়াত ব্যক্তিরা আমাদের দেওয়া জল পান করতে আসেন বা হেমন্তকালে আমাদের পূর্বপুরুষেরা, পরলোক থেকে আমাদের দেওয়া আকাশ-প্রদীপ দর্শন করে পরিতৃপ্তি লাভ করেন। তবুও অনেকেই এসব করেন। এই অনেকের মধ্যে তাঁরাও আছেন, যাঁরা এমনিতে পুজো-আর্চার ধার ধারেন না। তর্পণ করা বা আকাশ-প্রদীপ জ্বালানোর রীতি তাঁদের ভাবতে শেখায় যে তাঁদের পূর্বপুরুষ এবং উত্তরপুরুষ মিলে যে বংশধারা প্রবহমান, তার একটি অংশ হলেন তাঁরা। মহালয়ার দিন সম্পূর্ণ অপরিচিত এবং অনাত্মীয় প্রয়াত ব্যক্তিকে জলদান প্রথা তাঁদের ভাবতে শেখায়, আত্মীয়তার গণ্ডি ছাড়িয়ে এই পৃথিবীর সমস্ত মানুষ তাঁদের আপনজন এবং এই পৃথিবী তাঁদের মহা-আলয় বা এক বিশাল বাসস্থান। এক লহমার জন্যে হলেও তাঁরা উপলব্ধি করেন, সামান্য মানুষ হলেও তাঁরা অকিঞ্চিৎকর নন, আকাশভরা সূর্যতারা আর বিশ্বভরা প্রাণের মধ্যে তাঁরাও একটু জায়গা পেয়েছেন। ক্ষুদ্র পরিসীমার মধ্যে থেকেও নিজেকে এক বড়ো কিছুর অংশ বলে উপলব্ধি করা— এই হলো এইসব রীতির তাৎপর্য।

বলা বাহুল্য, যে-বিপুল সংখ্যক মানুষ এইসব রীতি পালন করেন, তাঁদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক ব্যক্তিই এত তলিয়ে ভাবেন। তবে যেকোনো রীতি বা প্রথা সম্বন্ধেই সে কথা সত্যি। যাঁরা ১৫ই আগস্ট জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জাতীয় সংগীত চলার সময় দাঁড়িয়ে ওঠেন, তাঁরা কজন দেশকে ভালোবাসেন? পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবী পরে যাঁরা ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্র-মূর্তির গলায় মালা পড়ান, তাঁদের কজন রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়েন? তা-বলে এই রীতিগুলো মূল্যহীন হয়ে যায় না। সংখ্যা দিয়ে সবকিছুর তাৎপর্য বিচার করা যায় না। তাই পূর্বপুরুষরা কোথাও নেই জেনেও আমরা যথোচিত ভাবগাম্ভীর্য-সহ মন্ত্রোচ্চারণ করে তাঁদের জলদান করি। সান্তা ক্লজ নামে কেউ নেই জেনেও, বাচ্চারা তার রেখে যাওয়া উপহারের জন্যে সাগ্রহে প্রতীক্ষা করে। কারোরই মনে হয় না, বছরের পর বছর চলে আসা মিথ্যে কল্পনা-ভিত্তিক এইসব প্রথার অবসান হওয়া দরকার। যে স্বপ্ন এত মধুর, মিথ্যে হলেও কেউই সেই স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠতে চায় না।

Go Back

Comment

Protected by Mathcha