দেবাশিস বসু
আমি কেমন মানুষ? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে আমি মানুষটা আসলে কেমন। অবাক লাগছে, তাই না? আমি কেমন-সেটা আমি নিজে জানি না?
না, জানিনা। আমার মনে হয় কোন মানুষই জানেনা সে নিজে ঠিক কেমন। অন্যের কাছ থেকে প্রশংসা আর দুর্নাম দুটোই তো পাওয়া যায়, কিন্তু কোনটার কতটা ঠিক, সেটা কি করে বোঝা যায়?
নিজেকে জিজ্ঞেস করে? আরে, আমার কাছে তো আমি একজন আদর্শ দেবতুল্য মানুষ। আমার মার কাছে আমি সোনার গোপাল। স্ত্রী ভাবেন আমি বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী। ছেলে মেয়েদের কাছে নিশ্চয়ই আমি এক চ্যাম্পিয়ন বাবা। কোন বন্ধুর আমি প্রিয় সখা, আবার কারও কাছে অপ্রয়োজনীয় আর হয়তো বা স্বার্থপরও। প্রতিবেশীরা কেউ মনে করে আমি বেশ মানুষ, আবার কেউ ভাবে আমি শুধুই ওদের খুঁত ধরতে জানি। অফিসের অধস্তন কর্মচারীদের কাছে আমি এমন একজন স্যার, যে কখনও ভুল করেন না। আর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষর কাছে আমি এমন এক 'সেমি' অপদার্থ, যে প্রায় কোন কাজই ঠিকমত করতে পারে না। কাজে ভুল হলে অবশ্যই আমি দায়ী, না হলে কিন্তু আমার কোনই কৃতিত্ব নেই। এরকম আরও অনেক উদাহরন আছে।
প্রত্যেক মানুষই গুন আর দোষের সমাহারে তৈরী। যদি কারও গুন (+) আর দোষ (-) এর সংখ্যার যোগফল অন্তত (+১) হয়, তাহলে তাকে মোটামুটি মানুষের পর্যায়ে ফেলা যায়।
যোগফলের উত্তর যত বেশী হবে, সে তত ভাল মানুষ। গুরুতর কোনও দোষ থাকলে অবশ্য সে বাতিলের খাতায়, কারন তার যোগফল শূন্যেরও তলায়।
এবার প্রশ্ন হল আমার পয়েন্টের যোগফল কত? সেটা জানা থাকলে বোঝা যাবে আমি কেমন মানুষ। আমি জানি যে আমি বাতিলের খাতায় নই। কিন্তু আমার পয়েন্টের যোগফল কি (+১) অর্থাৎ কোনরকমে পাশ করা, নাকি না টুকে সম্মান জনক নম্বর পেয়ে পাশ করা? এটা অত্যন্ত কঠিন একটা প্রশ্ন। কিন্তু অনেক ভেবেও যখন উত্তর পেলাম না তখন ভাবনা ত্যাগ করলাম।
যাই হোক, বয়স তো চলল গড়িয়ে। সময় আসছে বিদেয় নেবার। শেষ বেলায় যখন আমি বিছানায় শুয়ে, আমার মনে হল আমার বোধহয় আর হাতে বেশী সময় নেই। আর তখনই হঠাৎ মনে ফিরে এল সেই প্রশ্নটা - আমি কেমন মানুষ? কেন মনে হল এই সময়ে? আসলে উপলব্ধি করতে পারলাম যে এই শেষ সময়ে আমার দোষ গুনের যোগফল আমি নিজেই হিসেব করতে পারব। আর সেটা তখনই পারব যখন আমি আর ইহলোকে থাকব না। কারন আমার দোষগুনের ব্যাপারে লোকে সত্যি কথা তখনই বলবে যখন আমি আর তাদের মধ্যে নেই। কারন আমি তো ওদের কথা আর শুনতে পাব না।
আমি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলাম। অর্থাৎ আমার দেহ নিস্প্রান হয়ে গেল কিন্তু আমার প্রাণটা ফুরুৎ করে দেহ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে আশপাশেই ঘুরঘুর করতে লাগল, লোকের কথা শোনার জন্য।
প্রথমে শোনা গেল কান্নার আওয়াজ। বেশ কিছু আওয়াজ ছিল সকরুন, তবে কিছু আওয়াজ ছিল ভারী অদ্ভুত, হঠাৎ উচ্চকন্ঠে কান্নার শুরু আবার আচমকাই শেষ। কেউ কেউ আবার আমার দেহকে প্রনাম করেই পাশের লোকের সঙ্গে জগৎ-সংসারের অন্য বিষয়ে গল্প জুড়ে দিল।
আমার ছেলেমেয়েরা তাদের মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “নিজে চরম কষ্ট করেও বাবা আমাদের মানুষ করতে কোন ত্রুটি রাখেননি, নাহলে আজ আমরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারতাম না”- বেঁচে থাকলে আমার চোখেও জল আসতো।
কান্না আস্তে আস্তে থেমে গেল। চারিদিকে খবর ছড়িয়ে পরতেই আত্মীয়, বন্ধু, সহকর্মী, প্রতিবেশী ও অনান্য পরিচিত লোকজন আসতে শুরু করলো। তাদের আনা ফুল-মালাতে ঢেকে গেল আমার পার্থিব শরীর। কিন্তু আমার মন রইল সজাগ। একজন নিকট আত্মীয় ফিসফিস্ করে জিজ্ঞেস করল পাশের জনকে - “উইল করে গেছেন নিশ্চয়ই, এত রোজগার করলেন কি করে? ছেলে মেয়েগুলোর কপাল কি ভাল তাই না?” - হায় রে, একে তো আমার শুভাকাঙ্খী বলে জানতাম৷
-
এক প্রাক্তন সহকর্মী অন্য আর একজনকে বললেন “উনি আমাদের কথা খুব ভাবতেন, উনি কাজে ভুল করলেও, আমাদের ভুল কিন্তু ধরতেন না, তাই না?” – বলে আমার শরীরে মালা রেখে প্রনাম করলেন, বেঁচে থাকলে দীর্ঘশ্বাস পড়ত। আর একজন প্রাক্তন সহকর্মী বললেন “খুব খাটত, কিন্তু আমরা ওকে সেটা বুঝতে দিতাম না, বলতাম কাজে মন দাও। ভেবে এখন খারাপ লাগে।”
আরও শুনলাম - “রোজ সকালে হাঁটতে যেতেন, দেখা হলেই বলতেন ভাই কেমন আছ? আমি বুড়ো আঙ্গুল তুললে, বলতেন, কাঁচকলা দেখাচ্ছো কেন, বলে ঠাট্টার হাসি হাসতেন”। কানে এলো আর একজন বলছেন, “অনেকবার বলেছিলাম আমার ছেলেটির জন্য একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে। খুব চেষ্টা করেছিলেন নিশ্চয়ই, যদিও পারেননি।” কেউ বললেন,“আমার নাতিকে পড়াতেন মাঝে মাঝে, গল্পও শোনাতেন।
আবার কিছু নতুন তথ্য যোগ হল - “শুনেছি নাকি ছেলের বিয়েতে যৌতুক নিয়েছিলেন, হয়ত মেয়ের বিয়েতে দিতে হয়েছিল। নইলে ওনার মতন মানুষ এমনটা করতে পারতেন না” । এমনি আরও কিছু কথাবার্তা শুনলাম। কিছু শুনে ভালো লাগল আর কিছু শুনে একটু মনমরা হলাম। ধীরে ধীরে অনেকেই চলে গেলেন। আমারও দেহ সৎকারের ব্যবস্থা হল।
আমি তখন ভাবতে লাগলাম যে দেহ রাখার পরে যা যা শুনলাম, অঙ্ক কষে যদি তার যোগফল বার করি, কত পাব? উত্তরটা পেলাম। কিন্তু সেটা একদমই মনের মত হল না। তাই বার বার হিসেব করে দেখলাম ভুল করছি কিনা।
না, কোন ভুল নেই। অঙ্কের যোগফল হল শূন্য (০), যতগুলো (+) পয়েন্ট, ঠিক ততগুলোই (-) পয়েন্ট। অর্থাৎ কিনা আমি অত্যন্ত সাধারন গোছের একটি মানুষ ছিলাম।
মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল, কারন আমি তো নিজের সম্বন্ধে ..., যাক গে । আর ভেবে কি হবে? চোখ বুজেছি, চোখে তো আর জল আসবে না, তাই বিমর্ষ মনেই প্রানপাখি যথারীতি উড়ে গেল অন্য জগতে। যাওয়ার আগে এই প্রতিজ্ঞা করে গেল যে এর পরের জন্মে যেন অঙ্কের যোগফলে ০ র আগে অন্তত একটা ১ বসে।