মাধব চট্টোপাধ্যায়
প্রথমেই সবিনয়ে স্বীকার করি রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার প্রথাগত প্রশিক্ষণ লাভের সুযোগ আমার হয় নি। তবে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে আমার ভালো লাগে। রবীন্দ্রসংগীত আমার জীবনে এক আলোক-বর্তিকা। আমার ভাবনা- চিন্তার জগতে অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে রবীন্দ্রসংগীত। সেই সূত্রেই এই গান নিয়ে দু-চার কথা বলতে চাই। যাঁরা নিয়মিত রবীন্দ্রনাথের গান করেন, অন্যদের শেখান, তাঁরা স্বচ্ছন্দে এই লেখাটিকে “অনধিকার চর্চা” বলে চিহ্নিত করে বাজে কাগজের ঝুড়িতে নিক্ষেপ করতে পারেন ।
বাংলা শেখার সুযোগ-বঞ্চিত ছাত্রছাত্রীদের উচ্চারণ সমস্যা
বাংলার বাইরে (ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বা বিদেশে), অবাঙালি বা বাংলা-শিক্ষার সুযোগ-বঞ্চিত বাঙালি ছেলেমেয়েদের যাঁরা রবীন্দ্রসংগীত শেখান, তাঁদের নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এখানে (হায়দ্রাবাদে) আমাদের পরিচিত এক গায়িকা তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের রবীন্দ্রনাথের কোনো গান শেখানোর আগে যখন পড়ে শোনান, তাদের অধিকাংশ বাঙালি হলেও গানটা তারা লিখে নেয় ইংরেজি (রোমান) অক্ষরে। কারণ স্কুল-কলেজের পড়ার চাপে বাংলা শেখার সুযোগ তাদের হয় নি। বলা বাহুল্য সব বাংলা শব্দ যথাযথ উচ্চারণে ইংরেজি অক্ষরে লেখা সম্ভব নয়। ফলে নিজেদের শ্রুতিলিখন দেখে গানটা গাইবার সময়, তারা কিছু কিছু শব্দ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। বারবার বলে বলে শিক্ষিকা তাদের সঠিক উচ্চারণ করতে শেখান। এই সমস্যাটা দেশের বাইরে আরও বড়ো আকারে দেখা দেয় যদি ছাত্র বা ছাত্রী বিদেশী হয়। বারবার প্রশিক্ষণ দিয়েও কিছু কিছু শব্দের উচ্চারণ তারা সঠিকভাবে করতে পারে না। তখন তারা যতটা পারছে, তাই দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে হয়। এটুকু বিচ্যুতি মেনে নিতেই হয়। রবীন্দ্রসংগীতের এক কিংবদন্তী শিল্পী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনে গিয়ে এক বাঙালি শিক্ষয়িত্রীকে এ ব্যাপারে বেশি কড়াকড়ি না করার যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তা খুবই বাস্তবানুগ ।
সম্ভবত রোমান অক্ষরে রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলেই আজকাল বেশ কিছু গায়ক-গায়িকা “আজ বাংলা দেশের হৃদয় হতে” গানটির দ্বিতীয় ছত্র (তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী”) এক অদ্ভুত উচ্চারণে পরিবেশন করছেন (তুমি এই অপ- রূপ রূপে বাহির হলে জননী)। বলা বাহুল্য, উচ্চারণ বিকৃতির ফলে ওই অংশের অর্থটাই বদলে যায়। প্রশিক্ষকদের দায়িত্ব, এমনটা যাতে না ঘটে সেদিকে লক্ষ রাখা।
রবীন্দ্রসংগীতে যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক
রবীন্দ্রনাথের গানে যন্ত্রের ব্যবহার একটি বহু-আলোচিত (এবং বহু-বিতর্কিত) বিষয়। রবীন্দ্রনাথ নাকি তাঁর গানে একমাত্র এসরাজ বাজানো পছন্দ করতেন, আর তাঁর গানের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজাতে গিয়ে অনেককে তাঁর অপ্রিয়ভাজন হতে হয়েছে। পরিবর্তিত যুগের সঙ্গে তাল রেখে এখন শিল্পীরা বিভিন্ন পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন। এসরাজ তানপুরা হারমোনিয়ামের ক্রমবিবর্তন শেষে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে নানারকম পশ্চিমী বাদ্যযন্ত্র। এতে আপত্তির কোনও কারণ দেখি না। আমার মতে কি কি যন্ত্র নিয়ে শিল্পী রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন সেটা বড়ো কথা নয়, একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হল তিনি কিভাবে যন্ত্রগুলি ব্যবহার করছেন। একসময় নানারকম পশ্চিমী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে দেবব্রত বিশ্বাস যেসব রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করেছেন, সেগুলির ভাবগ্রহণে শ্রোতাদের কোনও অসুবিধে হয় নি। তবে এ ব্যাপারে ভারসাম্য রাখতে না পারলে, যন্ত্রের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে যদি গান-বাজনা, বাজনা- গানের আকার নেয়, শ্রোতারাই সেটা বর্জন করবেন।
নতুন প্রজন্মকে বাংলা গানের দিকে আকৃষ্ট করতে হলে গায়কীতেও হয় তো কিছুটা অদল-বদল করতে হতে পারে। তবে কেউ শুধু তানপুরা বা হারমোনিয়াম নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইলে তাকে ফাঁকা ঘরে গান গাইতে হবে, একসময় রবীন্দ্রসংগীত ফসিলে পরিণত হবে (এমনটাই বিশ্বাস করেন অনেকে), সেটা মনে হয় না। শ্রোতাদের মধ্যে অনেক বিভিন্ন রুচির মানুষ থাকেন। যাঁরা তানপুরা বা হারমোনিয়াম নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করবেন, সংখ্যায় কম হলেও, কিছু শ্রোতা তাঁরা পাবেন। মূল কথা একটাই- কি গাওয়া হচ্ছে এবং কেমন গাওয়া হচ্ছে। গানের মর্মবাণীকে যদি শ্রোতার মনের গভীরে পৌঁছে দেবার ক্ষমতা শিল্পীর থাকে, তিনি তানপুরা হারমোনিয়াম সিনথেসাইজার –যাই ব্যবহার করুন, কিছু লোক তাঁর গান শুনতে যাবে। সত্তরের দশকে কলকাতায় দেখেছি, যাঁরা দেবব্রত বিশ্বাসের গান শুনতে যেতেন, তাঁদের একাংশ সুবিনয় রায়ের গানের অনুষ্ঠানেও ভিড় করতেন। রবীন্দ্রসংগীতের একটা অন্তর্ভেদী শক্তি আছে। শিল্পী কি লয়ে গাইছেন কি যন্ত্র নিয়ে গাইছেন- এসব বিষয় পাশে সরিয়ে রেখে তা শ্রোতার মনের দুয়ারে ঘা দেয়। অনেক যন্ত্রপাতির সাহায্য নিয়ে যেসব গানকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, রবীন্দ্রসংগীত তাদের পর্যায়ে পড়ে না-সংগীতশিল্পী না হলেও এই কথাটা বুঝতে অসুবিধে হয় না।
রবীন্দ্রসংগীতে কথার গুরুত্ব
যে কোনো রচনার একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে। রবীন্দ্রসংগীতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তার বাণীর কাব্যসুষমা। রবীন্দ্রনাথ একজন উঁচু দরের কবি ছিলেন। তাই তাঁর গানের সাহিত্যমূল্য অপরিসীম। “চাঁদ উঠেছে আকাশে বোসো আমার বাঁ-পাশে” জাতীয় গানে কথা এদিক-ওদিক হলে বড়োরকমের বিচ্যুতি হয় না, রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে সেটা হয়। রবীন্দ্রসংগীত শোনবার সময় আমরা গানের কথা আর সুর দুই-ই উপভোগ করি। তাই গানের কথায় যথেচ্ছ অদল-বদল ঘটালে রসভঙ্গ হয়। তাছাড়া গানের কথা গীতিকারের নিজস্ব সৃষ্টি। তাই, কোনো গান জনপ্রিয় করা বা অন্য কোনো অজুহাত দিয়ে সেই গানের কথা বদলে দেওয়ার অধিকার কারও থাকতে পারে না। কোনো গান অপরিবর্তিত রাখলে যদি সেটা কালক্রমে ফসিলে পরিণত হয়, তাহলে মানতেই হবে সেটাই তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। গানের কথা বদলে দিয়ে সেই পরিণতি রোধ করা সম্ভব নয় ।
রবীন্দ্রসংগীতের বিশেষজ্ঞ বলে যাঁরা পরিচিত ছিলেন, তাঁরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। এঁদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথ বা তাঁর সান্নিধ্যধন্য প্রবাদ-প্রতিম শিল্পীদের কাছে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন গানের তালিম নিয়েছেন। দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া “ তুমি রবে নীরবে' গানটি আমাদের মন ভরিয়ে দেয়। কিন্তু “মম দুঃখ বেদন মম সফল স্বপন” র বদলে দেবব্রত বিশ্বাস “মম দুঃখ বেদন মম সকল স্বপন” গাওয়ায় গানটি বিশ্বভারতীর অনুমোদন পায় নি স্বয়ং অনাদি দস্তিদারের আপত্তিতে। দেবব্রত এই গানটি সংগ্রহ করেছিলেন “বীণাবাদিনী” পত্রিকা থেকে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর- সম্পাদিত এই পত্রিকায় অনেক রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি ছাপা হয়েছে। অনাদিবাবুকে এই যুক্তি গ্রহণ করাতে না পেরে দেবব্রত রবীন্দ্রসংগীত-অনুমোদন কমিটির আর এক সদস্য নীহারবিন্দু সেনের দ্বারস্থ হলেন ৷
অনাদিবাবুর কাছে সমস্যাটি সম্বন্ধে আগেই তিনি অবগত হয়েছিলেন। বীণাবাদিনী ও গীতবিতান-এই দুই আকর গ্রন্থে গানটির ওই অংশ দুরকম ছাপা হওয়ার উল্লেখ করে তিনি রবীন্দ্রসংগীতের আর এক বিশেষজ্ঞ ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীকে একটি চিঠি দিলেন। ইন্দিরা দেবী উত্তরে জানালেন তাঁর খাতাতেও “সকল স্বপন” লেখা আছে। অনাদিবাবুর অনুমোদন পেল দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া “তুমি রবে নীরবে”। দেবব্রত নিজের ইচ্ছেয় “সফল”কে “সকল” করেন নি, রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞরা মর্যাদা দেন এমন একটি পত্রিকা অনুসরণ করেই গানটি গেয়েছিলেন। তবুও, গানটি যে বিকৃত করা হয় নি-সেটা প্রমাণ করতে তাঁকে এত কাঠখড় পোড়াতে হলো ।
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় রকমফের
রবীন্দ্রসংগীতের বিশেষজ্ঞরা জীবিত থাকতেই বিভিন্ন রবীন্দ্রসংগীতের কথায় কিছু কিছু অদল-বদল ঘটেছে। শুধু রবীন্দ্রনাথের গানে নয়, কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায় রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য রচনাতেও। রবীন্দ্ররচনা কপিরাইট-মুক্ত হবার পর, বিপুলায়তন রবীন্দ্ররচনাবলী থেকে অজস্র লেখার (কবিতা, গল্প, নাটক) অজস্র সংস্করণ ছাপা হচ্ছে। যাঁরা ছাপছেন, তাঁদের অনেকেই লেখাটি রবীন্দ্ররচনাবলী থেকে না নিয়ে পূর্ব-প্রকাশিত কোনো বই থেকে ছাপছেন। সেখানে কোনও ভুল থাকলে সেটাই বারবার ছাপা হচ্ছে। আসল সংস্করণটি হারিয়ে যাচ্ছে।
শঙ্খ ঘোষ তাঁর এক রচনায় এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে সহজ পাঠের বিভিন্ন সংস্করণেও। এছাড়া গোড়ায় গলদ রবীন্দ্ররচনা প্রকাশেও হয়েছে। প্রথমে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত “আমি আমায় করব বড় এই তো তোমার মায়া” রচনাটি প্রায় তিরিশ বছর গীতিমাল্যতে “আমি আমায় করব বড় এই তো আমার মায়া” ছাপা হয়েছে। তারপর, কানাই সামন্ত নামে বিশ্বভারতীর এক নিষ্ঠাবান কর্মীর উদ্যোগে এই ভুল সংশোধিত হয়েছে। নানারকম ভুল ঢুকেছে অনুবাদেও। একটি ক্ষেত্রে ভুল সংশোধন করে দিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
যাঁরা এসব অনিচ্ছাকৃত এবং অসাবধানতা-জনিত ভুল-ত্রুটি আবিষ্কার করে উদ্যোগ নিয়ে, সংশোধন করার দায়িত্ব নিতেন, সেই মানুষগুলি এখন এক বিপন্ন প্রজাতি। ফলে ভুল সংশোধনের সম্ভাবনা কমছে। তার ওপর রবীন্দ্ররচনার ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে নিজস্ব সৃজনশীলতার নিদর্শন রাখছেন অনেকে। হাতে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি থাকলে যা খুশি তাই করার প্রবণতা এদেশে ক্রমশ বাড়ছে। এদের অপকর্ম দেখে “বাহবা বাহবা বেশ” বলার লোকেরও অভাব হয় না আমাদের সমাজে। সর্বশক্তিমান (যদি কেউ থাকেন) এদের হাত থেকে আমাদের চিরায়ত সাহিত্য-সম্ভারকে রক্ষা করুন।
তথ্যসূত্র
১) রাহুল রায় 'সাগরপারের স্বরলিপি'। 'লিরিকাল বুকস', কলকাতা, ২) দেবব্রত বিশ্বাস : ঝর্ণাধারার মতো তাঁর গানের প্রবাহ
Unliversal, Unlive: August 22, (2022) www.google.com
পৃ- ৬১-৬২; (২০২৩)
৩) প্রতিবিম্ব: শঙ্খ ঘোষের লেখা ("প্রতিবিম্ব" পত্রিকায় ১৯৭৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত শঙ্খ ঘোষের রচনা সংকলন,
সম্পাদনা : প্রশান্ত মাজী) : রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ: স্বত্বমুক্তির ভালো-মন্দ, পৃ: ১১১-১৪২, ঋক প্রকাশনী, কলকাতা-৭০০ ০৭৯, (২০২১)