শ্রী মনিলাল চক্রবর্তী

(এই লেখা এক সময়ের দলিল- এক প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে, চার কুড়ি বছর পরেও যা স্মৃতির পাতায় তেমনি স্পষ্ট। সাম্প্রদায়িক বিভেদ সমস্ত বিশ্বের এক অনভিপ্রেত ঘটনা। সবকালেই তা কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের স্বার্থ চরিতার্থের কল। এখানে কোন বিশেষ ধর্মাবলম্বীর কথা বল্লেও তা আসলে সকল ধর্মের স্বার্থান্বেষী মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য )
এখন আমার বয়স চার-কুড়ি পেরিয়ে ৮৬। তবু চোখ বুঝলে সেদিনগুলো ছবির মত দেখতে পাই। সব ছবি যে রঙিন তা নয়।
১৯৪৬ সালের অক্টোবর। প্রতিবারের মত বাড়ির পুজোর আয়োজন। পূর্ববঙ্গের নোয়াখালির শ্রীরামপুরে। আমার বাবা ওকালতি করতেন শ্রীরামপুর থেকে খাল পথে ২৩/২৪ মাইল দূরে, লক্ষ্মীপুর শহরে। প্রতিবছর বাবা মার সাথে পুজোর আগে আগেই শ্রীরামপুরের বাড়িতে আসতাম। লক্ষ্মীপুরে, আমাদের বাড়ির পাশেই খাল। সেই খালের সাথে বঙ্গোপসাগর যুক্ত ছিল। খালে তাই জোয়ার-ভাঁটাও হত। রাত্তির বেলা, সেই খালের পাড়ে, ভাড়া নৌকো হাজির হত। আমরা খেয়ে-দেয়ে নৌকোয় উঠে বসতাম। পুরো নৌকোটাই আমাদের ভাড়া করা। ভাড়া ছিল দুই টাকা। সেই সময়ে তো এক মন (৪০ কেজি) চাল মিলত ৫ টাকায়। ৩ পয়সায় ১ সের (প্রায় ১ কেজি) দুধ!! নৌকায় উঠেই আমরা পাটি, সতরঞ্ছি, তোষক, বালিশ, চাদর বিছিয়ে লাইন দিয়ে শুয়ে পড়তাম। মাঝিরা ‘আল্লাবিস্মিল্লার’ নাম করে নৌকা ছেড়ে দিত। একটা হ্যারিকেন জ্বলত নৌকার মাঝে। নৌকার পেছন দিকটায় মাঝিরা বেশ মজা করে পেঁয়াজ আলুর ঝোল আর ভাত রান্না করত। সারা রাত ওরা নৌকো বাইত। আমার সহজে ঘুম আসত না। মাকে ধরে শুয়ে থাকতাম। আকাশের ঝকমকে তারা আর খালপাড়ের নারিকেল-সুপারির গাছ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তাম নিজের অজান্তেই। সকালে জল তুলে মুখ ধোয়া। তারপর মুড়ি, ক্ষীরের সন্দেশ, আর নারকেলের নাড়ু দিয়ে প্রাতঃরাশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকা গিয়ে ভিড়ত আমাদের শ্রীরামপুরের বাড়ির খালপাড়ের ঘাটে। বাবা-মা আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করতে করতে নিজেদের ঘরে পৌঁছাতেন। আর আমরা ভাইবোনেরা গিয়ে হাজির হতাম বাড়ির দুর্গামণ্ডপে। সেখানে সুরথদা তখন প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত। সেখানেই কেটে যেত অনেকক্ষণ।
বহু বহু বছর আগে, সঠিক সময়টা জানা নেই, নোয়াখালির জমিদার আমাদেরই এক পূর্বপুরুষ, ত্রিলোচন চক্রবর্ত্তীকে ঢাকা থেকে নোয়াখালিতে নিয়ে আসেন পুজাচর্চাদি করাবার জন্য। বিস্তীর্ণ জমিও দান করেন। কয়েক একর বিস্তৃত সেই জমিতেই আমাদের জ্ঞাতিগুষ্ঠির বাস। ২০-২৫ পরিবার আর সাকুল্যে ২০- ২২ টা পুকুর। দুর্গামণ্ডপ একটাই। নোয়াখালির শ্রীরামপুরের চক্রবর্তী (পাওয়া উপাধি) বাড়ির সব পরিবারেরও একটাই পুজো।
পুজোর সময় সবার নতুন জামাকাপড় হত। ঢাকি, নাপিত, ধোপা এদের জন্যও জামাকাপড় এবং অর্থ বরাদ্দ থাকত। এছাড়া গায়ের বহু গরিব-দুঃখীদের জামাকাপড় দান করা হত। পুজোর সময় অন্নভোগ হত, শীতল ভোগ হত। বাড়ির সবাই এই তিন-চারদিন বড়-উঠোনে খোলা আকাশের নিচে বসে এক বা দুই পংক্তিতে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে খেতে বসত। ২০০/৩০০ জন প্রতি বেলা কলা পাতায় খাওয়া। ভাত (কখন খিচুড়ি), সুক্তো, মুগডাল লাউ দিয়ে, ডালনা, লাবড়া, কচুর তরকারি, চালতার চাটনি, পায়েস। রাতে দুর্গা মায়ের মোহনভোগ ও গাওয়া ঘিয়ের লুচি হত। আরো আনেক কিছু হত। সব চেয়ে মজা হত সন্ধ্যারতিতে। যারা আরতি করবেন তারা বিকেল থেকেই প্রস্তুতি নিতেন। সন্ধ্যার বেশ খানিকপরে আরতি শুরু হত। বাড়ির বউরা (বিশেষ করে নতুনরা) লালপেড়ে শাড়ি আর গয়না পরে দুর্গামণ্ডপের ভিতরে দুর্গামায়ের ডান পাশে থাকতেন। হিরালাল চক্রবর্তীদা, ব্রজেন্দ্র চক্রবর্তীদা, বুড়োদা, ব্রজলালদা এঁরা আরতিতে অংশ গ্রহন করতেন। ধুপে-ধুনায় মণ্ডপ ভরে যেত। আরতির জন্য মাটির বড় পাত্র ছিল। ছন্দে ছন্দে, ঢাকের তালে তালে, দুহাত দিয়ে দুটো আরতিপাত্র নিয়ে, নেচে নেচে আরতি করা হত। আরতি যখন জমে উঠত, ছন্দে ছন্দে বেজে উঠত কাঁসর- ঘণ্টা – শঙ্খ – ঢাক- ঢোল, মায়েদের উলুধ্বনিতে এবং শঙ্খধ্বনিতে তখন মৃন্ময়ী মূর্তি যেন চিন্ময়ী মূর্তি ধরে স্মিত হাস্যে সবাইকে মোহিত করে রাখতেন। অদূরে ঠাকুরঘরের পিছনের পুকুরপাড়ের কাঁঠালগাছটার ও আমগাছটার পাতাগুলিও যেন এই ধ্বনিতে আন্দোলিত হয়ে সকলকে আনন্দে উদ্বেল করে তুলত। দুঘণ্টা কি তারও বেশি আরতি চলত।
পূজার এই আরতির সময়কার একদিনের ঘটনা। আরতি যখন মাঝপথে, সেখানে আমার মাকে দেখতে না পেয়ে বাড়ির ভিতরে আমাদের ঘরের দিকে যাই। গিয়ে দেখি ঘরের সামনে মা চৌকাঠে হেলান দিয়ে ছোট্ট একটা পিঁড়িতে বসে অনবরত কেঁদে চলেছেন। খুব কষ্ট হল আমার মনে। মা কেন কাঁদছেন? বুঝলাম গতবছর তার বড় মেয়ে হীরণ্ময়ী, আমার বড়দিদি, পুনেতে থাকাকালীন মারা গিয়েছেন। দিদি এই পুজোতে নেই। মায়ের কাছে আমি কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। তারপর উঠে যখন আমার ভাইপো হরিদের ঘরের কাছে গিয়ে দেখি, হরির মা, শৈলবৌদি দরজার সামনে বসে অঝোরে কেঁদে চলেছেন। হরির মায়ের বাপের বাড়ী দেবপাড়া। জমিদার বংশের মেয়ে তিনি। বিয়ে হয় আমাদের বাড়ীতে হরেনদার সাথে। হরেনদা অকালে চলে গেলেন। রেখে যান ৮ মাসের হরিকে। বৌদি তাকে কোলে পিঠে করে, সহস্র আদর সোহাগ দিয়ে মানুষ করেন। হরির মা সেদিন কাঁদছিলেন তার প্রয়াত স্বামীর বিরহ বেদনায়। তারপর আমি আবার অদূরেই পূজা মণ্ডপে চলে আসি। তখন নবমীর আরতি সমাপ্ত। ঠাকুরকে ভোগ দেওয়া হয়ে গেছে। সবাইকে মোহন ভোগ আর লুচি প্রসাদ দেওয়া হচ্ছে।
তার পরেরদিন দুপুরেরদিকে বিজয়া দশমী লাগলেই প্রতিমাকে বিসর্জন দেওয়া হবে এই বড় পুকুরে। বিসর্জনের আগে নারকেল খেলা হত। একটি গাছে নারকেল রাখা হত। তারপর তার চারদিকে জল দিয়ে জায়গাটা পিচ্ছিল করে দেওয়া হত। তারপর নারকেল কাড়াকাড়ি খেলা শুরু হয়। দুটি দল থাকে। বেশ অনেকক্ষন ধরে যুদ্ধ চলত। যারা জিতবে তারা পুরস্কার পেত। মায়েরা দুর্গামাকে সিঁদুর পরিয়ে দিত। বাতি দিয়ে আরতি করত। আর যা বিধি পালন করার তা করা হত। তারপর ঢাক, ঢোল, করতাল, কাঁসর সব বাজিয়ে দুর্গামাকে নিয়ে ২০০/৩০০ হাত দূরে শোভাযাত্রা করে বড়পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হত। আমরা জলে নেমে সাঁতার কাটতাম। তারপর সবাই স্নান সেরে এসে মণ্ডপে এসে বসতাম। সকলের কপালে মঙ্গলদীপ সমেত কুলো স্পর্শ করানো হত। সকলের মাথায় শান্তির জল ছিটিয়ে দেওয়া হত। সবাই জীবনে সর্বকাজে জয়যুক্ত এবং বিজয়ী হয়ে উঠুক। শুরু হত প্রণাম আর কোলাকুলি। সেইসব মধুময় দিনগুলি স্মৃতির পটে লেখা আছে।
১৯৪৬ সালের দুর্গাপুজো শেষ হল আতঙ্কের মধ্যে। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। বুঝতে পারছি, পরিবেশ ক্রমশঃ ভয়ঙ্কর হচ্ছে। বাবা কাকারা নিজেদের মধ্যে প্রায়ই উদ্বিগ্নমনে কথাবার্তা বলে চলেছেন। শুনছি সে বছরেই আগস্ট মাসে (১৬ই আগষ্ট,১৯৪৬) কলকাতায় রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় হাজার-হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশ বিভাগের দাবিতে মুসলিম লীগ নাছোড়বান্দা। নোয়াখালীতে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর দাঙ্গা করতে মুসলিমরা প্রহর গুনছে। পুজার পর পরই শুরু হয়ে গেল দাঙ্গা। বাঙ্গালী হিন্দুদের মধ্যে যারা প্রভাবশালী তাদের মূল লক্ষ্য করা হল। মেরে ফেলা হতে লাগল। রাত্তিরবেলায় ঘুম নেই। এদিক ওদিক থেকে সমস্বরে দল বেঁধে এসে ওরা একেকদিন একেকবাড়ীতে আগুন লাগিয়ে চলে যায়। মনে পড়ে, একদিন আমাদের শ্রীরামপুরের গ্রামের বাড়ীতে বিকেলবেলায় আমাদের ঘর থেকে দুশ হাত দূরে পুকুরপাড়ের দোল বেদিতে রাস্তার ধারে দাড়িয়ে আছি আর দেখছি আকাশে কেবল কালো ধোঁয়া উড়ছে। পূর্ব-পশ্চিম–উত্তর–দক্ষিণে এই দৃশ্য দেখেছি। আমাদের বাড়ীর কাছে পুরোহিত বাড়ীর এক বৃদ্ধ ওখানে দাড়িয়ে ছিলেন। তিনি এ দৃশ্য দেখতে দেখতে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন। ওরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে, বাড়ীতে বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। পাঁচশো থেকে একহাজার লোক বা তার উর্দ্ধে এক এক দলে লোক থাকে। হাতে লাঠি, ছোরা, দা, আগুন, আল্লার ধ্বনি দিতে দিতে আসে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আল্লায় এদের বিশ্বাস নেই, এদের উদ্দেশ্য নিরীহ মানুষের প্রাণনাশের মধয় দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি। ওদের একটা লিস্ট থাকে। আগের রাত্রে মিটিং করে ঠিক করে গ্রামের বড় বড় বাড়ি কোনগুলি এবং কতগুলি আছে যেখানে আক্রমণ করা যায়। আমাদের যারা শুভাকাঙ্ক্ষী, মুসলমান বন্ধুরা আছে তারা আমাদের গোপনে সংবাদ দিয়ে যায়।
আমাদের এখনও মনে আছে, আমরা বাড়ীর ১৫/১৬ জন যুবক একসাথে মিলিত হয়ে আমাদের বাড়ীর দালানের উপরে (দোতলার খোলা বারান্দাতে) অনেক ইট, পাথর জমায়েত করি। লাঠি, দা, ছোরা ইত্যাদি রাখি। আক্রমন করতে এলে প্রতিহত করবো। নোয়াখালীর বিখ্যাত করপাড়া চৌধুরী বাড়ীতে তারা এরকম ব্যবস্থা করেছিল। ওদের বন্দুকও ছিল। মা বোনেরা সব দালানের ছাদে উঠে গেল এককাট্টা হয়ে। আক্রমণকারীরা যখন আসে, তারা গুলি করে। অনেকে মারা যায়, পালিয়ে যায়। লাশ পড়লেই সাথে সাথে নিয়ে যায়। ক্রমশ ওরা চতুর্দিক থেকে দলে ভারী হয়ে আসতে থাকে। যতক্ষণ গুলি ছিল চৌধুরীরা যুঝে গেছে। গুলি এখন ফুরিয়ে গেছে। তখন দালানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আর অন্যান্য ঘরেও আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। মেয়েরা তাদের হাতের, গলার, পায়ের অলংকারাদি সব ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে যদি ওরা ফিরে যায়। নামার সিঁড়িতে আগুন। ধ্বসে পড়ছে ইট, পাথর। তারপর ওরা একটা লম্বা নারকেল গাছের গোড়া কেটে ছাদের সাথে যোগসাধন করে দিয়েছে। টেনে টেনে ওই নারিকেল গাছ দিয়ে চৌধুরীদের ছাদ থেকে নামিয়ে এনে সামনের একটা ছোট ঘরে নিয়ে নৃশংস ভাবে কেটে ফেলেছে। এভাবে ওরা ওই করপাড়া চৌধুরীবাড়ীর বহু যুবককে হত্যা করেছে। পরে গান্ধীজী যখন করপাড়া চৌধুরীবাড়ীতে যান তখন আমি সাথে ছিলাম। পথে ওই বাড়ীর একজন মহিলা হাউ হাউ করে বাপুজীর পায়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। তার স্বামীকে ও ছেলেকে কেমন নৃশংসভাবে কেটে ফেলেছে সেই বর্ণনা তিনি কেঁদে কেঁদে বলছিলেন। সেই নারকেল গাছটার গোড়া কেটে ছাদের সাথে কেমন করে লাগিয়ে দিয়েছে তাও দেখেছি স্বচক্ষে।
আমাদের বাড়ি যখন পুড়ে ছাই হয়ে গেল আমরা তখন বাড়ীর পাশের এক জঙ্গলে লুকিয়েছিলাম। অন্যান্য বাড়ির লোক মিলিয়ে প্রায় ২০০-২৫০ জন। ভোর রাতেই আমরা বাড়ি ছেড়ে বের হই। আমাদের ট্রাংক ভর্তি কাঁসার জিনিসগুলি মা বাবা আমি ধরাধরি করে পিছপুকুরে (যেখানে খাবার পড়ে, বাড়ীর মায়েরা বাসন মাজে, স্নান করে, কাপড় কাচে) ফেলে দিলাম। প্রত্যেক হিসার লোকেরা সারা রাত ধরে এই কাণ্ড করে। ঘরের মেঝেতে গর্ত করে দামী কাপড় চোপর ও অন্যান্য শখের জিনিষপত্র সব নিয়ে স্তূপাকার করে রেখে মাটি দিয়ে চেপে রাখি। মনে আছে রাত্রিবেলায় যে কাঁসার থালা ও বাটিতে দুটি বাসিভাত খেয়েছিলাম, তা আর মেজে ঘরে আনিনি। পিছপুকুরেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আসি। এভাবে সারারাত যুদ্ধ চলে। টেবিল, চেয়ার, চৌকি যা পাচ্ছি সবই পুকুরে ফেলে দিচ্ছি সারারাত ধরে। পুকুরের জল যেন এক বিঘৎ ফুলে উঠল। সব ঘরেই এই কাণ্ড চলছে। ঘুম নেই, শরীর ক্লান্ত ও অবসন্ন। ভোর না হতেই, বাড়ীর পিছনদিক দিয়ে সবাই বের হয়ে পড়ি। মশার কামড়ের মধ্যেও, জঙ্গলে একজোট হয়ে সবাই থাকি। ভোরেই আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। মেঝের জিনিষপত্র কোদাল দিয়ে খুঁড়ে নিয়ে যায় এবং আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেয়। দু-এক জন আমাদের বাড়ীর দাদারা কেঁদে কেঁদে এসে বাবাকে বাড়ি পুড়ে যাবার কথা বলে। শীতলদা মাথায় হাত দিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকেন। চোখে সকলেরই জল। তাও প্রাণে বাঁচতে হবে। ওদের হত্যাতালিকায় যেসব বিশিষ্ট লোকের নাম ছিল তার মধ্যে আমার বাবা ও আমার দাদা অনুকুলদা ছিলেন। কারণ আমার দাদা ছিলেন অনুশীলন সমিতির সদস্য এবং যিনি মহানায়ক রাসবিহারী বসুর সহকর্মী। পেছনের ধোপা বাড়ীর পাশে একটি সুপারি বাগানের পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে পালিয়ে যাচ্ছিলেন বাবা। হঠাৎ দুজন আক্রমণকারী এসে বাবাকে ধরল। তাদের হাতে কাস্তে, ধারালো দা। বাবাকে তারা চিনত না। তারা কাস্তে তুলল মারবে বলে, কি আছে দে। বাবার হাতে রুমাল ও মায়ের একখানা ৫ ভরির সোনার হার। বাবা আস্তে আস্তে গিঁট খুলছেন। টাকার গিঁট খুলে যা ছিল তা ওদের সব টাকা দিয়ে দিলেন। আর আঙ্গুলের মুঠোর মধ্যে আর একটা গিঁটেতে সোনার হারটি ছিল। মুঠোটা বন্ধ করে রুমাল থেকে যা পেল তাই ওদের দিয়ে দিল। বাবা রক্ষা পেলেন। সবারই তো তা হয়না। সোনারপুর বাজারের বিখ্যাত কাপড়ের ব্যাবসায়ী ভয়ে তাদের বাড়ীর মেয়েদের মাঝখানে আত্মগোপন করে ছিল। জানতে পেরে সেই বলরাম বাবুকে মেয়েদের মধ্যে থেকে টেনে অদূরে নিয়ে যায় ওরা এবং মাথায় আঘাত করে খান খান করে কেটে ফেলে। কত লোক যে এভাবে নৃশংস ভাবে হত্যা হয়েছে তাঁর অন্ত নেই। ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাস। সকাল হয়েছে। আমরা ৪/৫ বাড়ীর লোক কোথায় যাব? কোথায় থাকব? কোন ঠিক নেই। বাবা এবং অনুকুলদা ঠিক করলেন সবাই মিলে গোঁসাই বাড়ীর আঙ্গিনায় (উঠানে) থাকব। তাই যার যার মত মাথায় জিনিসপত্রের পুঁটুলি নিয়ে সমবেতভাবে গোঁসাই বাড়ীতে এসে উঠি। দুপুর হয় হয়। আমাদের বাড়ীর পূর্বদিকেই গোঁসাই বাড়ি আধা ক্রোশ দূরে। ওখান থেকে রামগঞ্জ থানা প্রায় দুই মাইল। বাবা এবং অনুকুলদা খোঁজ নিলেন যে থানার আশেপাশে প্রায় ২০/২৫ হাজার আক্রান্ত মানুষ জমায়েত হয়েছে। আমরাও সেখানে যাব।
কিন্তু বিপদ বাড়ল নতুন করে। এদিকে আমরা যেখানে গোঁসাই বাড়ীতে সাময়িক ভাবে অপেক্ষা করছিলাম দেখতে পেলাম গোঁসাই বাড়ীর পুকুরের পাশের সদর রাস্তা দিয়ে অসংখ্য মুসলমান যারা আজাহার বাহিনী বা আনসার বাহিনী নামে পরিচিত, লম্বা লাইন দিয়ে হাতে হাতে লাঠি নিয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য, আমাদের কলেমা পড়াবে, নমাজ করাবে এবং গরুর গোস্ত ভক্ষন করিয়ে ধর্মান্তরিত করবে। আমার বাবা বলতেন প্রানরক্ষার্থে গরুর মাংস খেলে বা কলেমা পড়লেই কি ধর্মান্তরিত হয়ে জায়, ধর্ম কি এতই ঠুনকো?
এদিকে অনেকক্ষণ হয়ে গেল। ওরা আর কেউ আসছে না। অন্য কেউ কেউ এসে খবর দিল যে তারা অন্য গ্রামে চলে গেছে। আপনারা থানায় চলে যান প্রাণ নিয়ে। বাবা ও অনুকুলদাও একটু বাইরে গিয়ে খোঁজ খবর নিলেন। হঠাৎ বাবা হন্তদন্ত হয়ে এসে বললেন সবাই থানায় চল। বের হও। মুহূর্তের মধ্যে আমরা রামগঞ্জ থানার অভিমুখে হাঁটা দিলাম। খিচুড়ি রান্নার আয়োজন চলছিল, তা আর সমাপ্ত হয়নি। মুড়ি চিড়ে যা সাথে ছিল তা খেয়েই রওনা দিলাম। অনেকে খেতেও পারেনি। সময় নেই। মাথায় পুঁটুলি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় বিকালের শেষ ভাগে আমরা থানার কাছাকাছি এক বাড়ীর দিকে যাচ্ছি। পথের মাঝে মাঝে দেখছি, ভলান্টিয়াররা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন অনবরত গাছের ডাল কেটে ও বাঁশগাছ কেটে লম্বা লম্বা লাঠি এক একটা করে সবার হাতে দিচ্ছে আর বলছে, জিনিষপত্র রেখে ও মা বোনদের রেখে চলে আসুন, লাঠি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ান। পথে কাদা, পা ডুবে যাচ্ছে,আমরা চলেছি মজুমদার বাড়ির দিকে। জলা জায়গা ও রাস্তা, ঐ পথ দিয়ে কার ইচ্ছায় বা কেমন করে জানি না আমরা মজুমদার বাড়ীর কাছাকাছি চলে আসি। মজুমদার বাড়ি থানার অন্দরেই। এই গ্রামটার নাম মনে পড়ছে না। আমরা সন্ধ্যায় ঐ বাড়ী এসে গেলাম, দেখি চতুর্দিকে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি দিতে দিতে মানুষ হাঁটছে। লোকে লোকারণ্য। থানার পুলিশ অফিসার ও অন্যান্যরা সব নিষ্ক্রিয়। তাদের উপর কোন আদেশ নেই, দাঙ্গা মোকাবিলা সংক্রান্ত।
মজার ব্যাপার এই, যে কয়েকদিন এসব কান্ড চলবে বা চালাবার পরিকল্পনা থাকবে সেই কদিন প্রশাসন রক্ষাকর্তা কেউ নেই। লক্ষ্মীপূজোর আগের দিন আমাদের বাড়ী ধ্বংস হয়েছিল, আমরা সবাই সেই পুরোহিত বাড়ির পিছনের জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সবচেয়ে ভয় ছিল কুমারী মেয়েদের নিয়ে। আমার এক সুন্দরী ভাইঝি ছিল, সে কেঁদে বলেছিল, “আমাদের তো জোর করে ধরে নিয়ে যেতে আসবে”। জঙ্গলের কাছে নীচু জলা-জায়গায় মা বোনেরা সব একসাথে জড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার হাতে একটা রামদা ছিল। দুর্গাপূজার সময় তা দিয়ে পাঁঠা কাটা হত। আমি রামদাখানা হাতে নিয়ে ঐ ভাইঝিকে সেদিন বলেছিলাম -“যদি তোকে কিছু করে বা আক্রমণ করে তবে আমি রাম দা দিয়ে তাদের নিপাত করব। যতক্ষণ প্রাণ থাকে যুদ্ধ করে যাব। তোকে কেউ কিছু করতে পারবে না”। এই বলে তাকে ও অন্যান্যদের আশ্বস্ত করি, সান্ত্বনা দিই।
অক্টোবর মাসের শেষার্ধে দাঙ্গা একটু কমতির দিকে। আস্তে আস্তে কলকাতা ও অন্যান্য জায়গা থেকে সৈন্যদল ও স্বেচ্ছাসেবকেরা আসতে শুরু করল। দাঙ্গাবিদ্ধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণশিবির হল, অনেক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কংগ্রেস, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ এবং অন্যান্য বিভিন্ন মিশন থেকে ত্রিপল, চাদর, চাল, ডাল, কাপড়-চোপর, কম্বল প্রভৃতি আসতে থাকল। শুরু হল উদ্ধারকাজ। হারিয়ে যাওয়া আত্মীয় স্বজনের খোঁজ। আমরা তখনও মজুমদার বাড়িতে থাকি। সেখানে আসেন আমার দাদা হীরালাল চক্রবর্তী, দাঙ্গার সময় তিনি চাকরিসূত্রে ছিলেন কলকাতায়। পরে সরকারী সাহায্যে পুলিশবাহিনীর সাথে তিনি আসেন রামগঞ্জ থানায় মা বাবার খোঁজ করতে। তিনি এবং মজুমদার বাড়ির এক দাদা নিকটস্থ সোনারপুর ক্যাম্পে যেতেন রোজ স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে,বস্ত্র এবং ত্রানসামগ্রী বিলি করতে। ঐ সময়ে একদিন দেখলাম সোনারপুর বাজারের একটি ফাঁকা গুদামঘরের মধ্যে এক কোণে একজন মাঝবয়সী লোক শুয়ে আছে। আরো অনেকে ছিল, তারা চলে গেছে, তিনি শীতে কাতরাচ্ছেন। তার জ্ব্বরও আছে। আমি তাকে একখানা কম্বল এবং একজোড়া কাপড় চেয়ে এনে দিলাম ওই ক্যামপ থেকে। তিনি খুশী হলেন।
আমরা মজুমদার বাড়ীতে অনেকদিন থাকি। ঐ বাড়ীতে নান্টু মজুমদার বলে আমার বয়সী একটি ছেলে ছিল। তার সাথে আমার খুব ওঠা বসা ছিল, একসাথে একপাতে বসে দুজনে কত খেয়েছি। তার সাথে পরে আর দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। শুনেছি সে কলকাতার খিদিরপুর ডকের ইউনিয়ণের একজন হোমরা-চোমরা ব্যক্তি, একজন বড় নেতা হয়েছিল। কোথায় যে কে ছুটে গেল, আত্মীয়স্বজন কোথায় যে কে চলে গেল তা ভেবে দিশেহারা হই। সংস্কৃতি, কৃষ্টি, বড়বাড়ীর চালচলন ও ঐতিহ্য, পরস্পর হৃদ্যতা সব সমূলে ভেঙ্গে চুরমার, অবলুপ্ত, এ যে কি অবস্থা যারা ভুক্তভোগী, তারাই শুধু বোঝে।
সমস্ত ভারত তখন টলমল। চতুর্দিকে নোয়াখালির নারকীয় ঘটনা রাষ্ট্র হয়ে গেছে। রাজনৈতিক নেতারা বিভ্রান্ত, দিশেহারা, কম বেশী সবাই মর্মাহত। এই সময়ে রাষ্ট্রনায়ক মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালির দাঙ্গার কথা শুনে অস্থির হয়ে ওঠেন। ৬ই নভেম্বর ১৯৪৬ সালে তিনি কাজকর্ম সব ফেলে নোয়াখালির অন্তর্গত সোদপুরে আসেন। সেখান থেকে চাঁদপুর, চৌমুহনী, হাজীগঞ্জ আসেন। দত্তপাড়া, কাজিরখিল ইত্যাদি স্থানে বেশ কিছুকাল সময় কাটান। তারপর ২০শে নভেম্বর ১৯৪৬ সালে আসেন আমাদের গ্রাম শ্রীরামপুরে। এরমধ্যে তিনি অনেকটি দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করে খুবই বেদনাহত হন। সত্য এবং অহিংসার বাণী নিয়ে তিনি এসেছেন। ২৭শে নভেম্বর ১৯৪৬ সালের গভীর রাত্রিতে মহাত্মাজী শ্রীরামপুর রাজবাটীতে এসে পৌঁছান। রাজবাড়ী, আমাদের চক্রবর্তী বাড়ী থেকে এক মাইল পূব দিকে।
আজগান্ধী এবং কানুগান্ধীও গান্ধিজীর সাথে ছিলেন। শুনেছি রাজবাটীতে তাঁকে খাবার সময়ে নোয়াখালির একটি মিষ্টি খাবার দেওয়া হয়, তা হাত দিয়ে তৈরী করা হয়। আগুন লাগে না। তার নাম "হাত-অম্বল'। নারিকেল কুড়িয়ে নিয়ে পাটায় বেটে একটা পাথরের বাটিতে তা নিয়ে, তার সাথে একটু নুন, সামান্য তেুঁতুল, চিনি এবং লেবুপাতা বা সামান্য গন্ধরাজ লেবু দিয়ে এবং পরিমাণমত জল দিয়ে হাতের আঙ্গুল দিয়ে মিশিয়ে নেওয়া হয়। তা খেয়ে তিনি খুব প্রশংসা করেছিলেন, বলেছিলেন - এটা অতি উপাদেয় খাদ্য। প্রায়ই তিনি তা খেতেন। একথা আমরা অনুকুলদার কাছে শুনেছি। তিনি সর্বক্ষণ গান্ধীজির সাথে থাকতেন শ্রীরামপুরে আসার সময় থেকে। তারপর আমার আরো মনে আছে রামগঞ্জ থানার অদূরে কাঞ্চনপুর বলে একটি গ্রামে গান্ধীজী গিয়ে জনতার উদ্দেশ্যে ভাষন দান করেছিলেন, সন্ধ্যা হয় হয় এমন সময়ে। আমি তাঁর অদূরেই দাঁড়িয়েছিলাম। তিনি ছোট একটি টেবিলে বসে মাইকের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তখন হিন্দি বুঝতাম না। একজন দাদা (খুব সম্ভব সতীশদাই হবেন) তা একটা খাতাতে লিখে নিচ্ছেন। তিনি স্টেনো। তারপর তাঁর বক্তৃতার অনুবাদ শুনে আমরা চলে যাই। গান্ধীজি প্রায় দেড়মাস অবধি নোয়াখালী ছিলেন। অনেক বড় বড় নেতা ঐ সময়ে নোয়াখালিতে গিয়েছেন এবং তাঁকে দর্শন করেছেন এবং তাঁর সাথে শলা পরামর্শ করেছেন। শরৎচন্দ্র বসু, ভারতীয় রাষ্ট্রদূত আসফ আলী, সুচেতা কৃপালনী, মৃদুলা সরাভাই, গোপীনাথ বরদলুই (আসাম) প্রমুখ ঐ সময়ে নোয়াখালী আসেন এবং সাক্ষাৎ করেন। মুসলমান নেতৃবৃন্দও তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। ২৭শে ডিসেম্বর, স্বয়ং পন্ডিত জওহরলাল নেহরু গভীর রাতে নানা পথ ঘুরে শ্রীরামপুর রাজবাটীতে এসে পৌঁছান এবং গান্ধীজির সাথে সাক্ষাৎ করেন। গান্ধীজির সাথে তিনি একান্তে কথা বলেন।
দেড়মাস অবধি শ্রীরামপুরে অতিবাহিত করার পরে ২রা জানুয়ারী ১৯৪৭ সালে গান্ধীজি চন্ডীপুর (শ্রীরামপুর গ্রাম থেকে প্রায় দু'মাইল দক্ষিণে) যাবার পথে আমাদের বাড়ীতে আসেন। সেই প্রকান্ড বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ দেখেন। এখানে তিনি খুবই বিমর্ষ হন। ৫/৬ মিনিট কাল নীরবে বসেন। তাকে কমলালেবুর রস দেওয়া হয়। তা তিনি পান করেন। তারপর পরবর্তী স্থানে যাবার জন্য প্রস্তুত হন এবং পদযাত্রা শুরু করেন চন্ডীপুর যাবার জন্য। গান্ধীজি বহু মুসলমান বাড়ীতেও যান। শান্তির কথা বলেন। কতখানি কি হয়েছে তার হিসাব নিকেশ করতে চাই না। তাঁর এই দরদী, মর্মস্পর্শী, সরল সাধুতাকে সহস্র কোটিবার স্বাগত জানাই।
এই জঘন্য হিংসা এবং রাহাজানি এবং খুনোখুনির মধ্যেও এমন সব দেবতুল্য মানুষ আছেন যারা সততই দয়ালু। বহু হিন্দু চরম বিপদে মুসলমান বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই আমরাই এক জেঠতুতো দাদা আমাদের বাড়ী পুড়িয়ে ফেলার আগের দিন রাতে এক মুলসমান বাড়ীর অন্দরে আশ্রয় নিয়েছিলেন সপরিবারে। ঐ সব মুসলমান মা বোনেরা তাদের সর্বক্ষণ প্রহরা দিয়ে রেখেছিলেন।
এদিকে আমরাও আর কতদিন সেই মজুমদার বাড়ীতে থাকব। নোয়াখালি জেলার চতুর্দিক থেকে গ্রামগঞ্জের হতভাগ্য বাস্তুহারা দুর্গত মানুষ গুলি ট্রেনযোগে, স্টীমার যোগে, বিভিন্ন যানবাহনের সহায়তায় প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে অনাহারে, অনিদ্রায়, রাতদিন আসাম, পশ্চিমবঙ্গ (কলকাতা), বিহার, ত্রিপুরা, ওড়িষ্যা এবং অন্যান্য নিরাপদ স্থানে যেতে থাকে। বিভিন্ন শরনার্থী শিবিরে গিয়ে ওঠে। নাম লেখায় আবার কেউ কেউ সেখানে যাদের আত্মীয়স্বজন আছে সেখানে গিয়ে উঠতে থাকে। অজানা জায়গাতেও অনেকে চলে যায় সরকারী নির্দেশে। কত লোক যে পথে ঘাটে মারা যায় তা বর্ণনাতীত। কত দুর্দশা, নিদারুণ দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে মানুষ প্রাণের দায়ে ছুটে আসছে। সে বর্ণনা বড়ই যন্ত্রনার। বোঝে প্রাণ বোঝে যার। আমার বাবা, কাকা, জেঠা পরিবার পরিজন নিয়ে কলকাতায় এবং আশপাশ অঞ্চলের নিজেদের ছেলেদের বাড়ী এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়ী এসে ওঠেন।
আমরা চলে আসি কলকাতায় নবীনকুন্ডু লেনে (কলেজস্ট্রীটের কাছে) আমার দাদার বাড়ীতে। বাবা সেখানে কিছুদিন থেকে আবার দেশের বাড়ীতে এবং কর্মস্থলে, লক্ষ্মীপুরে মা সহ ফিরে আসে। এ সময়ে (১৯৪৭ সাল) আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার কথা। আমি দাদার বাসায় থেকে গেলাম। আমহার্স্ট ষ্ট্রীটে হিন্দু একাডেমী বলে একটা স্কুল আছে, তার প্রধান শিক্ষক জ্ঞানবাবু ছিলেন আমাদের দেশের লোক। আমার দাদা তার সাথে সাক্ষাৎ করে অনুরোধ করে ঐ বছরে (১৯৪৭) ঐ স্কুলের মাধ্যমে ম্যাট্রিক পরীক্ষার টেস্ট পরীক্ষাতে বসাবার জন্য, প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসাবে। তিনি সম্মতি প্রদান করেন। প্রায় ২৫০ / ৩০০ জন ছাত্র ঐ স্কুলে ১০ম শ্রেণীতে পড়ে এবং সবাই পরীক্ষার্থী, আমিও একজন। আমি সহজেই টেস্ট পরীক্ষায় পাশ করে গেলাম। সমস্ত ছেলেদের মধ্যে আমি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। আমার অনেক কিছু বিনামূল্যে হয়ে গেল। শুধু ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফিজ বাবদ ৩০টি টাকা দিয়ে ফাইনাল ফর্ম পূরণ করেছিলাম। একদিন টেস্ট পরীক্ষার যখন পাশের খবর শুনে ঐ স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকছি, তখন কয়েকটি সহপাঠী ছাত্র আমাকে ঘিরে খুব আদরের সাথে একপ্রকার ধরাধরি করে দোতালায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বসবার ঘরে নিয়ে যায়। ঐ স্কুলে সকালের বিভাগে মেয়েরা পড়ে এবং দুপুরে ছেলেরা পড়ে। সকালের যিনি প্রধান শিক্ষিকা, তিনি প্রখ্যাত সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের সহধর্মিনী। তিনি আমাকে ওই সময়ে দেখে খুব খুশী হলেন। খুব উৎসাহ এবং প্রেরণা দিলেন। কি নিদারুণ অবস্থা এবং বিপাকের মধ্য দিয়ে পরীক্ষা দিয়েও আমি ভাল ফল করেছি, তাতে তিনি খুব খুশী হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে যখন ‘সিটি কলেজে' (রাজা রামমোহন রায় কলেজে) পড়ি, তখন ওনার স্বামী শ্রী নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (যিনি খুব ঢোলা ও লম্বা সাদা পাঞ্জাবী পরে আসতেন) মহাশয় আমাদের বাংলা ক্লাসের অধ্যাপক ছিলেন (১৯৪৮ - ১৯৪৯)। খুব ভাল পড়াতেন।
এদিকে সারা পূর্ববঙ্গ থেকেই প্রতিদিনই শরনার্থীরা দলে দলে ভিটা মাটি ছেড়ে শিয়ালদহ স্টেশনে আসতে থাকে। আমি কলেজে পড়বার সময়ে সেখানে শিয়ালদহ স্টেশনের ভলান্টিয়ার্স- ক্যামেপ গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকের নাম লেখালাম এবং শরনার্থীদের সেবার কাজে নিযুক্ত হলাম। শরনার্থীদের সরকারী অফিসের নিয়ে গিয়ে তাদের ‘রিফিউজী কার্ডের’ ব্যবস্থা করে দিতাম এবং বিভিন্ন স্থানে পাঠাবার ব্যবস্থা করতাম আদেশানুযায়ী। কলকাতায় রাজাবাজার অঞ্চলে বহু মুসলমান পরিত্যক্ত আবাসস্থানে অনেককে আশ্রয় নেবার জন্য পাঠানো হয়। একদিন রাজাবাজার অঞ্চলে গিয়ে অনেককে দেখি যারা শরনার্থী হিসাবে শিয়ালদহ এসেছিলেন। এভাবে শিয়ালদহ ষ্টেশনে সকাল বিকাল দুবেলা যেতাম কত মানুষকে বাংলার বাইরে, বিহার, ওড়িষ্যা ও আসামে ও ত্রিপুরাতে পাঠানো হয়। দন্ডকারণ্যেও পাঠান হয়। সে যে কি দিন গেছে, তা বাংলা মায়ের ছেলেরাই মর্মে- মর্মে অনুভব করেছে। আমার দাদা এসব সেবামূলক কাজে খুব উৎসাহ দিতেন।
এর মধ্যে আমি সিটি কলেজ থেকে আই. এস.সি পাশ করে বি.এস.সিতে ভর্ত্তি হই। নবীনকুন্ডু লেন থেকেই পড়াশুনা করি। বাবা-মা দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। অনেকেই দেশের বাড়ীতে যাননি বা ফেরেননি, আবার অনেকেই দেশের বাড়ীতে ঘর করে বসবাস শুরু করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর কেউ থাকতে পারেনি নানা অসুবিধার কারণে সকলেই চলে আসতে বাধ্য হয়। আমাদের বাড়ীর সবাই চলে এসেছেন। আমার মাতৃদেবী শ্রীরামপুরের বাড়ীতে ঐ পোড়া ভিটামাটির ঘরেই হঠাৎ পরলোক গমন করেন। আমরা ছেলেরা তখন তার কাছে কেউই ছিলাম না। আমার পিতৃদেব দ্বারকানাথ চক্রবর্ত্তী মায়ের মৃত্যুর আগেই কলকাতায় নবীনকুন্ডু লেনে পরলোক গমন করেন ১৯৫৪ সালে।
একা যখন থাকি আমি, এসব স্মৃতি, বাড়ী ঘর পোড়ানো, দুঃখকষ্ট, আত্মীয়স্বজন, পরিচিত বন্ধুদের কথা মনে হয়- তখন বিহবল হয়ে যাই।