চন্দনা খান

সারাদিনের যুদ্ধের শেষে এইটাই তার প্রথম নরম বালিশ। ইরিণ কাঠের লম্বা সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথমেই ডেডুলাসের সাদা লোমের নরম শরীরে মুখ ডুবিয়ে দিলো। ডেডুলাস সন্ধ্যাবেলায় ইরিণের ঘরে ঢোকার মুখে কাঠের সেলফটার ঠিক ওপরের তাকে জম্পেশ করে শরীর ফুলিয়ে বসে থাকে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে বড় একটা খেলনা বেড়াল। ইরিণ যখন ডেডুলাসের গলা জড়িয়ে আদরসুলভ শব্দ করতে থাকে তখন ডেডুলাসও মিউ মিউ করে সাড়া দেয়। সারাদিনের একাকিত্বের পর ডেডুলাস মালকিনকে দেখে সত্যিই খুশি হয়, কেননা এরপর বড় বাটিতে করে রাতের খাবার রাখা হবে আর ইরিণ বাইরের জগতের সব ঝড়ঝাপটা থেকে বেরিয়ে এসে ডেডুলাসের কাছে দুরন্ত লেনদেনহীন, আপস-সমঝোতাহীন একধরনের শান্তি পায় ।
অথচ এই কয়েকমাস আগেও ডেডুলাসের সঙ্গীর অভাব ছিল না। ইরিণের আরও দুটি পোষা বিড়াল ছিল - ফ্যারো ও ফ্যান্সি। গায়ের রং যথাক্রমে বিস্কুটরঙা ও কালো। ফ্যারোর বিস্কুটরঙা গায়ে কিছুটা সাদা ছোপ, কপালে ও পায়ে। ফ্যান্সি উজ্জ্বল কালো, তার গায়ের লোম শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনের কালো চুলের মতো মসৃণ। সবচেয়ে চটকদার তার জেড- সবুজ চোখ। ধারণা করা যেতে পারে যে সে সেই চোখের রশ্মিতে বহু পুরুষ বেড়ালের হৃদয় ভেঙে দিয়েছিলো ।
ইরিণ যখন গতবার ইন্ডিয়া গেলো ছবি আঁকার এক রেসিডেন্সিতে যোগ দিতে, তখন ডেডুলাস, ফ্যারো ও ফ্যান্সিকে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হলেও সে তাদের জন্য যথাসম্ভব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। তার বাড়ী থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে তার মেয়ে থাকে। ইরিণ তাকে বেড়ালের খাবার কেনা, তাদের মাঝেমাঝে এসে দেখে যাওয়ার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলো। এপ্রিল বলে যে কালো মেয়েটা তার পেয়িং গেস্ট, তাকে সে বেড়ালদের নিয়মিত খাবার দেওয়া ও একটু সঙ্গ দেওয়ার কথা বলে গিয়েছিলো ।
ইরিণের ধারণা যে তার চারমাসের অনুপস্থিতি কালে তার মেয়ে সফিয়া বা এপ্রিল – কেউই তাদের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে নি । খাবার দাবার হয়তো ঠিকই দিয়েছিলো, কিন্তু তাতে আদর ছিলো না, বেড়ালদের সাথে তাদের সুখদুঃখের গল্প ছিলো না , তাদের স্পর্শ করা ছিলো না । নাহলে ফ্যারো আর ফ্যান্সি এত কম বয়সে মারা গেলো কেন? সে এসে শুনলো যে তাদের কি অসুখ হয়েছিলো । শেষের দিকে তারা ঠিকঠাক খাচ্ছিলো না। তারা ইরিণের অভাব অনুভব করছিলো এটা মনে করে ইরিণ কষ্ট পেতে পারে, কিন্তু এতে তার আত্মপ্রসাদ অনুভব করার কোন কারণ নেই। ডেডুলাসশুধু ওল্ড গ্র্যান্ডফাদারের মতো এখন বসে থাকে।
ডিভোর্সের পর পেনিসিলভ্যানিয়ার এই বিশাল বাড়ীতে ইরিণ সত্যিই একলা হয়ে পড়েছিলো । সাথী বলতে এই তিনটে বিড়াল। তাই ভারতবর্ষের একটা শহর থেকে এক মাসের রেসিডেন্সির আমন্ত্রণ আসার পরে সে পেনিসিলভ্যানিয়ার বরফসাদা শীতকে টা টা করে উষ্ণ দেশে অনেক নতুন বন্ধুর মাঝে এসে নিঃশ্বাস ফেলেছিলো । তার কোন নাক উঁচু নেই বা ঝকমারি নেই, সে সব পরিস্থিতিতেই মানিয়ে নিতে পারে নতুন দেশের নতুন খাবারের স্বাদ তার ভালোই লাগে। সবচেয়ে বড় কথা সে খুবই খুশি হয়েছিলো লক্ষ করে যে তার থেকে কম বয়েসী ছেলেরাও তার সাথে বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী। তাদের অনেকের ইংরেজি চলনসই, অনেকেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা বলে, আর অনেকেই ভাষার ঘাটতি মধুর হাসি দিয়ে পূরণ করতে চেষ্টা করে। দেশের বাইরে গিয়ে সে প্রথম উপলব্ধি করলো যে আমেরিকা যৌবনের উপবন হতে পারে, কিন্তু প্রৌঢ়ত্বের নির্বাসনভূমি। যদিও আমেরিকায় ষাটোর্ধ বাণপ্রস্থের কোন লিখিত নিয়ম নেই, কিন্তু কমবয়সীদের আচার ব্যবহারে তাদের যেন কোন আদিম জগতের অধিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে ।
ইরিণের দেহমন ভেতরে ভেতরে কোন সঙ্গীর জন্য আকুল হয়েছিলো। তাই যখন রেসিডেন্সি সূত্রে ইকবালের সাথে আলাপ হলো ও ইকবাল নিয়মিত তাকে স্কুটারের পেছনে বসিয়ে এদিক ওদিক নিয়ে যেতে লাগলো, তখন সে ইন্ডিয়ায় থাকার মেয়াদ আরও তিনমাস বাড়িয়ে দিল, ইকবালের সাহায্যে এক আধাবস্তি এলাকায় দুই কামরার এক ফ্ল্যাট ভাড়া নিলো । ইরিণের পয়সাকড়ির তেমন স্বচ্ছলতা নেই আজকাল, এর বেশি ভাড়া দেওয়া সম্ভব নয়। মেয়েকে জানাতে যে সে আরও তিনমাস পরে আসবে, মেয়ে বিরক্ত হয়ে জানালো যে ইলেকট্রিসিটি বিল এসে পড়ে আছে, গ্যাস শেষ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর বিড়ালরা খাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে ।
ইরিণ মেয়েকে ইমেলে জানালো যে সে যেন বিলগুলি একটু দিয়ে দেয়, ইরিণ ফিরে এসে শোধ করবে । সে অবশ্য জানে যে মেয়েও আর্থিকভাবে খুব ফুরফুরে অবস্থায় নেই, তারও বছরখানেক আগে ডিভোর্স হয়েছে, সেও দুখানা ছেলেমেয়ে সমেত এক পুরুষসঙ্গীর সাথে লিভ্- টুগেদার করছে ।
ইরিণ জানে যে এবারই হয়তো তার শেষ সুযোগ। বয়সের এই প্রান্তে দাঁড়িয়ে তার বাছাবাছি করার বিরাট ক্ষেত্র নেই । এই ভারতবর্ষীয় যুবক তার প্রতি অনুরক্ত। সাধারণ ভারতবাসীর মতো তার মুসলিম বা খ্রিস্টান সম্বন্ধে কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি নেই। তা ছাড়া ইরিণের মতো ইকবালও একজন আর্টিস্ট । ইরিণ তার আঁকা ছবির মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পায়। ইরিণ মনে মনে এই আশা পোষণ করে যে সে যদি ইকবালকে আমেরিকায় নিয়ে আসতে পারে তবে তাকে পেন্টিং-এর কোন শর্ট কোর্সে ভর্তি করিয়ে দেবে। তারপর আর ইকবালকে ফেরত যেতে হবে না, সে আমেরিকাতেই করে খেতে পারবে। ইকবাল এখনেও কোন চাকরি করে না, এক মা ছাড়া আর কোন বন্ধন নেই, অতএব ইকবালের আমেরিকায় পাড়ি দিতে কোন অসুবিধে নেই ।
দেশে যাওয়া পিছনোর এই তিনমাসে ইরিণ ও ইকবাল যুগ্মভাবে অনেক ছবি আঁকলো, দু একটা গ্যালারিতে এক্সিবিশন করলো, আশেপাশের কিছু ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে এলো। কোন আধুনিক এন্টারটেইনমেন্ট পার্কে তার উৎসাহ নেই । আধুনিকতার শ্রেষ্ঠ চমকগুলি সে তার নিজের দেশেই দেখে এসেছে । ইরিণ তার অসমবয়সী প্রেমিকের সাথে তোলা অনেক ছবি ফেসবুকে পোস্ট করলো। যাতে বন্ধুরা দেখতে পায় । দেখতে পায় আর ভাবে যে ইরিণের এখনও রোম্যান্টিক অ্যাপিল আছে ।
বাধা এলো অন্যদিক থেকে। তিনমাস পরে ইরিণ ভেবেছিলো যে সে ইকবালকে নিয়েই দেশে ফিরবে, কিন্তু বাধ সাধলো আমেরিকান অ্যামবেসী। বিশেষ কোন কারণ দেখালো না, কিন্তু অনুমান করা যেতে পারে যে একে কোন স্থায়ী কর্মসংস্থান নেই, তারপর মুসলিম, তাই আমেরিকা তাকে নিজেদের দেশে পা ফেলতে দিতে উৎসাহী নয়। ছমাস পরে ভিসার জন্য আবার দরখাস্ত করতে বলে ইরিণ আমেরিকা ফিরে এলো।
ইরিণের প্রধান কাজ কয়েকটি ইউনিভার্সিটিতে শিল্পসংক্রান্ত অনলাইন পড়ানো । মাঝে মাঝে ছাত্রছাত্রীদের ছবি বোঝানোর জন্য পেনিসিলভ্যানিয়া বা নিউইয়র্কের আশেপাশের মিউজিয়ামে তাদের আসতে বলা। তবে এই কাজটা সে মাঝে মাঝে পায়। অন্যান্য সময় শিল্প থেকে শতযোজন দূরে আছে এমন সব কাজও সে নিয়ে থাকে ।
এখন সে একটা নুতন ভাস্কর্যে হাত দিয়েছে । যখন সে কাজ করে, ডেডুলাস তার চারপাশে ঘুরঘুর করে। ইরিণ এখন হাত দিয়েছে বসা অবস্থায় একটা প্রমাণ সাইজ বুদ্ধমূর্ত্তি তৈরি করার দিকে। শেষমেষ দেখা গেলো যে বুদ্ধ গেরুয়া পরিধান পড়ে আছেন, তার সামান্য গোঁফদাড়ি আছে আর মুখে স্মিত হাসি। যারা ইকবালকে দেখেছে তারা একটু লক্ষ্য করলেই বলবে যে বুদ্ধের মুখের সাথে ইকবালের মুখের অদ্ভুত মিল।
ছমাস পরে ইকবাল আবার ভিসার জন্য আবেদন করে, আবার ভিসা নাকচ্ হয় । ভারতবর্ষের ইকবালের এক বন্ধু ই-মেলে ইরিণকে জানায় সে আজকাল ইকবালকে এক ইজিপ্টসিয়ান মহিলার সাথে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে । সেই মেয়েটি নাকি শহরেরই এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী । ইরিণও অনুভব করে যে ধীরে ধীরে ইকবালের ই-মেইল কমে এসেছে । গত একমাসে তার চিঠির উত্তরে ইকবালের সব উত্তরই ছিলো কেমন দায়সারা ।
নিজের কাছে স্বীকার করতে না চাইলেও ইরিণ মেনে নেয় যে ইরিণকে দিয়ে ইকবালের অভিলাষ পূর্ণ হয়নি। ইরিণ ইকবালের আমেরিকায় আরোহণের সোপান হতে পারেনি। নিজের থেকে কমবয়সী একটি ছেলেকে পার্টনার হিসেবে বন্ধুদের কাছে শো-অফ্ করায় একটা অহমিকা থাকতে পারে, কিন্তু উল্টোদিক থেকে এরকম শো-অফ্ করার কোন আকর্ষণ নাও থাকতে পারে, হোলও বা সাদা চামড়া তার ।
ইকবাল ইরিণের কাছে সাতসমুদ্র তেরো নদীর পারে বুদ্ধত্বে উত্তীর্ণ হয়েছে । ইরিণ তার উচ্ছল প্রেমের মাসুল হিসেবে দুই বিড়াল বন্ধুকে হারিয়েছে ।
ইরিণ ডেডুলাসকে কাছে টেনে তার নরম শরীরে মুখ ডুবিয়ে দেয়। এই শেষ বন্ধুকে সে হারাতে পারবে না।