মন্দিরা বসু
নতুন বছরের টাইম টেবিল টা পেয়ে কোন কোন ক্লাস পেলাম তাই দেখছিলাম। পাশ থেকে করুণা আমার টাইম টেবিল এ চোখ বুলিয়ে বললো ‘Mandira you got ‘9F’! All the best. কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- ‘এ কথার অর্থ?’ করুণার কথায় যা বুঝলাম তা হল 9F class এর ছাত্ররা খুব দুষ্টু, আর তার মধ্যে কেভিন এর দুষ্টুমিতে জুড়ি নেই। বহুবার বাড়িতে complain পাঠানো হয়েছে। বৃদ্ধ দাদু-ঠাকুমা আসেন। সব শোনেন আর বলে যান ‘Please take care of him’.
প্রথমদিন 9F এ গিয়ে বুঝতে দেরি হলনা কে কেভিন। ছোট্ট রোগা চেহারা। সদা হাস্য মুখ আর দুষ্টুমিতে ভরা দুটো বুদ্ধিদৃপ্ত চোখ। আমার পড়ানো শেষ হতে না হতেই কেভিন উঠে অন্য desk এ গিয়ে আর একটি ছেলের সঙ্গে গল্প করতে শুরু করে দিলো। বকুনি দিতেই ভাল মানুষের মত মুখ করে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়লো। পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
একদিন পড়তে পড়তে হঠাৎ দেখি কেভিন মাথা আর শরীরের খানিকটা desk এর মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কাছে গিয়ে বললাম “What are you doing?” কেভিন desk থেকে মাথা বেরকরে হেসে বললো “nothing teacher, I just want to understand how much of my body can be fitted in the desk.” বোঝ কাণ্ড। কোনও মতে হাসি চেপে পড়ানোতে মন দিলাম।
কেভিন text book আনেনা, সময়ে homework জমা দেয়না। ক্লাসে লুকিয়ে টিফিন খায়। Home work জমা দিতে বললে একটাই উত্তর “only one answer left teacher, I’ll submit by end of the day.” কিন্তু সেই end of the day আর আসেনা। এই ভাবে এক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পর কেভিনকে খুব বকলাম আর diary তে complain note লিখে দিলাম। কেভিন তারপরের সময়টুকু দেয়ালের দিকে মুখ করে desk এ মাথা রেখে কাটিয়ে দিল। বুঝলাম আমি যে ওকে বকেছি সেটা ওর একদম ভাল লাগেনি।
Incharge madam- এর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম কেভিনর বাবা মা কর্মসূত্রে আমেরিকাতে থাকে। কেভিন থাকে ওর দাদু-ঠাকুমার কাছে। নাতি তাদের কথা শোনেনা। ছেলে আর বৌমা বিদেশে থাকায় নাতিকে বকাবকি করতে ভয় পান। নাতিকে সামলাতে ওনারাও হিমসিম খান। বুঝলাম কেভিনকে বকেঝকে হবেনা, অন্য কিছু করতে হবে। ।
আবারও home work জমা দেওয়ার সময় চলে গেল। এবার অন্যভাবে কেভিনর উত্তর ‘only three maps are left’. হায় ভগবান! তিনটে map এর একটাও করেনি, তাও বলে only…….
মনে বিরক্তি চেপে বললাম, “Ok, come with the maps. I’ll help you to do the map markings.” “I don’t have maps teacher” – কেভিনের সহজ উত্তর। EDP থেকে map আনিয়ে, আমার drawer থেকে colour pencils বার করে কেভিনের পাশে বসে ওকে দিয়ে তিনটে map marking complete করালাম। Map তিনেটে note book এ সেঁটে দিয়ে সাকর্ণ বিস্তৃত হাসি হেসে ‘thank you teacher’ বলে কেভিন আমার হাতে ওর notebook তুলে দিল। এই ভাবে ধীরে ধীরে ওর সাথে আমার সম্পর্ক অনেক সহজ হয়ে গেল।
কেভিনের কাছ থেকেই জানতে পারলাম যে ও যখন class 7 এর শেষের দিকে তখন ওর বাবা-মা কাজ নিয়ে আমেরিকা চলে যান আর সঙ্গে নিয়ে যান ওদের ছোট ছেলে অর্থাৎ কেভিনের ছোট ভাই জয়কে। কেভিনের ‘Class 8’ হবে অর্থাৎ উঁচু class তাই বাবা-মা ওকে দাদু-ঠাকুমার কাছে রেখে যান। কেভিনের থেকে এই সব ঘটনা শুনতে শুনতে ওর দিকে তাকালাম, বলতে বলতে ছেলেটার মুখটা কালো হয়ে গিয়েছে আর উজ্জল চোখ দুটোও বড় ম্লান।
হায়রে শিশুমন। তার কাছে কি উঁচু class আর নিচু class? একটাই কাঁটা ওর মনে বিঁধে রয়েছে যে ওকে ফেলে মা ভাইকে নিয়ে আমেরিকা চলে গেল। ভালবাসার কাঙাল কেভিন , শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আর একটু স্নেহ পাওয়ার জন্য নানারকম দুষ্টুমি করে বেড়ায়, কিন্তু অবোধ মন জানেনা যে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য যে পথ ও বেছে নিয়েছে তাতে ওরই বদনাম হয়।
একদিন Incharge madam বারান্দা দিয়ে আমাকে যেতে দেখে বললেন ‘তুমি তো magic জানো’। অবাক হয়ে বললাম “magic”? জিজ্ঞাসা করায় জানতে পারলাম আবার কেভিনের ডাক পড়েছিল madam- এর ঘরে। Madam কেভিনকে বকুনি দিয়ে বলেছিলেন “সব teacher রা complain করছে তুমি home work জমা দিচ্ছনা। অনেক notes pending রয়ে গেছে।”
শুনে কেভিন বলেছিল “কিন্তু Mandira teacher complain করতেই পারেনা। আমি তো regular ওনার home work জমা দিই।”
হেসে madam কে বললাম “কথাটা সত্যি”।
সেইদিন মনে হয়েছিল এই শিক্ষকতার জীবনে এটা একটা বড় পুরস্কার।