Menu

Jadavpur University Alumni Association Hyderabad Chapter

(JUAAH)

Blog Search

গরিব রথ

সুশান্ত দত্ত

বিভাসবাবু নগার কানে একটা টান মেরে ধমক দিলেন, “সিঁড়ি ভাঙ্গতে আর কবে শিখবি অ্যাঁ? কবে শিখবি”। নগেন ওরফে নগার দিনটাই আজ সকাল থেকে কেমন যেন মেঘলা যাচ্ছে। সিঁড়িভাঙ্গা, সরল অঙ্কগুলো সময় সময়ই নগেনের জটিল মনে হয়। আর চৌবাচ্চার অঙ্ক তো কখনোই মাথায় ঢোকে না। সে বুঝে উঠতে পারে না যখন চৌবাচ্চার নল দিয়ে জল বেরিয়ে যাচ্ছে তখন কেনই বা কেউ এসে ওপরের কলটা খুলে রেখে যাচ্ছে। এসব নগার পণ্ডশ্রম মনে হয়।

নগেন ভালবাসে ছবি আঁকতে। ওই অঙ্কের খাতার আনাচে কানাচে ভরে উঠেছে তার সৃষ্টি সুখের উল্লাস। যেখানে সে তার নিজের দুনিয়ার স্রষ্টা। আর এই সব নীরব সৃষ্টি ছিল তার ভাবুক মনের অসাধারন প্রতিফলন। অঙ্কের লাভ-লোকসানের বাইরেও একটা হিসেব থাকে। সেটা সে নিজের মত করে বুঝতে চায়, দেখতে চায়।

নগেনের এই জগতের খবর রাখে মধু আর হরি। আর সবার অজান্তে বিভাস স্যার। বিভাস সরকার এক সময় নগেনের বাবা খগেন সরকারের সহপাঠী ছিলেন। নগার মধ্যে বিভাস স্যার তার সেই ছোটবেলার খগেনকে খুঁজে পান।

খগেনের মধ্যে ছিল একটা ভাবুক মনের শিল্পী সত্ত্বা। তার মধ্যে বড় শিল্পী হবার সম্ভাবনা ছিল। কালের ঘোরে, জীবনের তাগিদে খগেন মল্লিক এক ওষুধের দোকানের কর্মচারী। নামমাত্র মাস মাইনের বিনিময় পরের ধনে গোমস্তাগিরি করে চলেছে। মাসের শেষে যা হাতে আসে, তাতে পান্তাভাতে নুনের জোগান ঠিক মত হয়না।

বিভাস সরকার এই সব বৃত্তান্ত জানেন। খগেনের সাথে একবার বাজারে দেখা হলে বলেছিল – “তুই আবার ছবি আঁকাটা শুরু কর। তোর ছেলেটা তোর মতই ভোম্বল হয়েছে। আঁক কসার থেকে আঁকিবুঁকি কাটতেই বেশি দড়।”

খগেন দড়ি-পাকানো হাতে বাজারের থলেটা হেসে দুলিয়ে বলেছিল, “তুই একটু দেখিস।”

***      ***      ***      ***      ***

নগেনের দিনটা আজ সকাল থেকে কেমন যেন মেঘলা যাচ্ছে। কাল রথযাত্রা। ইস্কুল ছুটি। নগার খুব ইচ্ছে বন্ধুদের সাথে হাটে গিয়ে একটা রথ কিনবে। সঙ্গে জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রার মূর্তি।

মাকে সকালে বলেওছিল, বিকেলে ইস্কুল থেকে ঘোরার পথে হরি, মধু, নিতাইদের সাথে হাটে যাবে।

প্রথমটায় মা কিছু বলেনি। যখন নগেন একটু বড় সাইজের রথ কিনবে বলে আব্দার ধরল তখন মা শান্ত ভাবে তার দিকে ছেয়েছিল। বলেছিল “তুই এই বয়সেও রথের জন্য বায়না করছিস? তুই কি বড় হবি না?”

একটু লজ্জাই পেয়েছিল নগেন। তবে মায়ের কথাটা যে ঠিক ঠিক বুঝতে পেরেছিল তা নয়। বড়রা কি রথ টানে না? তাহলে মধু নিতাইরা...? মা বলে, “তাদের পয়সা আছে। আমাদের তো...।” মা কথাটা শেষ করতে পারেনি।

তা অবশ্য ঠিকই। তিনটে প্রাণীর সংসারের ভারসাম্য বজায় রেখে, নগেনকে বড় করে  তুলতে তাদের যে রথ তা টানতে হয় তিনশো পঁয়ষট্টি দিন – তার নাম গরিব রথ। তার চাকাগুলো এবড়ো খেবড়ো। দড়িটা শীর্ণ। জগন্নাথও তাতে নড়বরে, উদাসীন। কে জানে, সেও কোন ইংরাজি না জানা গরিব কিনা।

ইস্কুল থেকে ফেরবার পথে নগেন ঝিলটার ধারে গাছতলায় একটু বসল। কয়েকটা ভাঁড়ের টুকরো দিয়ে জলে ব্যাঙ বাজী করল।

নিতাই আর হরি গেছে হাতে রথ কিনতে। মধু গেছে মামারবাড়ি। যেখানে রথের মেলায় পাঁপড়ভাজা আর তালপাতার ভেঁপু কিনতে পাওয়া যায়।

ঝিলের ওধারে দুটো তালগাছ আর মুকুজ্জ্যে বাড়ির ফাঁক দিয়ে সূর্যি যাচ্ছে পাটে। টুপ করে আর একটা দিন শেষ হয়ে যাবে।

নগেন তার ভাবনার ঝাঁপি খুলে, ব্যাগ থেকে একটা খাতা কলম বের করে ছবি আঁকতে বসল। মুকুজ্জ্যে বাড়ির পাশ দিয়ে সূর্যি ডুবছে। ঝিলের জলে সেই সূর্যের অনেক টুকরো ছড়িয়ে যাচ্ছে। তালগাছ দুটো জলে ছায়া ফেলছে। দুটো ছোট্ট ছেলেমেয়ে রথের দড়ি টেনে নিয়ে চলছে। তাদের চোখে মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়েছে। 

নগেন তার সৃষ্টির মধ্যে এতোটাই বিভোর হয়ে ছিল যে সে বুঝতেও পারেনি কখন থেকে একজোড়া  করুণ চোখ তার উপর অনেকক্ষণ স্থির হয়ে রয়েছে। সে চমকে বাস্তবে ফিরল কারও কাশির শব্দে। বিভাস স্যারকে পিছনে  দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নগেন তাড়াতাড়ি খাতাটা বন্ধ করে নিল।

স্যার গলাটা একটু খক খক করে পরিষ্কার করলেন। তারপর নগার পিঠে দুটো চাপড় মেরে একটু হেসে বললেন, “উঠে পর, অনেক দেরী হয়ে গেল। চল হাটে যাই। একটা রথ কিনতে হবে। চল চল।”...

দুজনে ঝিলের ধারে হাটের দিকে চলতে থাকল। নগেন শুনছে স্যার আনমনে আওড়াচ্ছেন,

“একা একা চলতেছিলেম পথে,

আর এক পথিক জুটল কোথা হতে।... ”

নগেন অবাক চোখে দেখল, আজ সকালে যে মানুষটা সজোরে কান টেনে ধরেছিল, সেই বিভাস স্যারের চোখদুটো পরন্ত সূর্যের আলোতে চিক্ চিক্ করছে।

তারা হাটের দিকে চলতে থাকল।

Go Back

Comment

Protected by Mathcha