পিয়ালী চক্রবর্তী

কদিন ধরে বৃষ্টি চলছে একটানা। রাস্তার মোড়ে, পানের দোকানে বিক্রি কম। হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় বৃষ্টির জল ঢুকে লুজ গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেটটা ভিজে চপচপে। ছ-ছটা ছিল, ধুর। ক্লাবঘরে দরজা বন্ধ করার অবকাশ। ক্যারাম বোর্ডের মাথায় একশো পাওয়ারের বাল্ব ঝোলে। স্ট্রাইকারটা এ দেওয়াল, ও-দেওয়ালে মাথা কুটে একে ওকে জালে পাঠায়। পাড়ার ভুলু ৬ বাচ্ছাকে নিয়ে সাইকেল সারানোর দোকানে, ফাটা টায়ারের ফাঁকে কয়েকদিন ছুটি কাটায়। লাঞ্চ টাইমে পৌঁছে যায় দত্তদের গেটে। এ-বাড়ি, ও-বাড়ি বারান্দায় এক্সট্রা দড়ি টাঙ্গিয়ে অথবা ঘরের এপার-ওপার জামাকাপড় শুকোয়। নর্দমার জল উপছে উঠে রাস্তা ঢেকে দেয়।
তবুও ৯টা বাজলে ঘর-গেরস্থ থেকে বেরয় অনেকে। মনে রাগ, ভয়, অবিশ্বাস, ঘৃণা, খুশি, আনন্দ, দুঃখ সব নিয়ে একই ভাবে। দুই পা ডোবানো জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে চলে আজকের কর্পোরেটজীবি। দামী জুতোটা প্লাস্টিকে মোড়া, অফিসে পড়বে বলে। চশমার দুই কাঁচে মেঘলা আকাশের ছায়া পড়ে। মুখ গোমড়া মেঘেদের আড়ালে আশার আলো ঝিকঝিক করে। promotion, increment, appreciation, US যাবার হাতছানি। উল্টোডাঙ্গার মোড়ে জ্যাম, প্যাচপ্যাচে কাদা, অটোর লাইনে সামনের জনের ছাতা থেকে টুপটুপ করে জল পড়ে ঘড়ির কাঁচে। অনামুখো অটোওলা সব, যাত্রীরা বিপদে পড়লে ওদের দর বেড়ে যায়। পরের মাসে এইসব বিচ্ছিরি সময়ের মুখে চুন-কালি মাখিয়ে লাল রঙের অল্টো আসবে। সব লাইন পিছনে ফেলে মসৃন রাস্তা চিড়ে সল্টলেকের বহুতলের সামনে পৌঁছবে। অফিসের ঠান্ডা ঘরে ভেজা ভেজা ঘামশুকিয়ে যায়, কম্প্যুটারে কোডিং চলতে থাকে। client এর সব চাই, সব জিনিষের হিসাব। ইনভেন্ট্রি সফটওয়্যার - কটা ল্যাপটপ আছে, কটা ডেস্কটপ, কটা মাউস, কিবোর্ড একটা ক্লিকেই জানা যাবে। কেউ একটা কিছু ধার চাইল, লিখে পাঠাও, সবএন্ট্রি হয়ে থাকবে। ধার শোধ দিতে হয় সময়মত। নাহলে জ্বলজ্বল করবে কম্প্যুটারের পাতায়। সেও তো ধার নিয়েছে অনেক কিছু, ধার দিয়েওছে। লেখা নেই, কোত্থাও লেখা নেই। বাসস্টপের শেডের তলায় একটা লোকের ম্যাগাজিন, বই-এর স্টল ছিল। নামী-দামী ফ্যাশন ম্যাগাজিন, আউটলুক, আনন্দলোক, উনিশ-কুড়ির তলায় থাকত আরো অনেক বই। নিষিদ্ধ, নীল-নীল বই। টিন-এজের প্রিয় খাদ্য। চোখের ইশারায় চাইলে বার করে দিত লোকটা। কখনো ধারে দিতনা। একটা বই এ-হাত, ও-হাত বদল হয়ে ঘুরত বন্ধুদের মধ্যে। একদিন প্রবল বৃষ্টির দিনে বাবার অনুপস্থিতিতে ছাতা মাথায় দিয়ে ঢলঢলে মুখের মেয়ে দোকান সামলাচ্ছিল। ওর কাছে ওসব চাওয়া যায়না। একটা উচ্চ মাধ্যমিকের সম্ভাব্য প্রশ্নোত্তর এর বই তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল কত দাম? দাম শুনে রেখে দিতে গেলে মেয়েটা বললো, ‘নিয়ে যাও, কাল দিয়ে দিও’।
- ধারে দিচ্ছ? তুমি আমায় চেন?
- না, কিন্তু কাছাকাছি তো থাক
কেমন যেন মায়া পড়ে গেল। সেদিনও জলে ডোবা রাস্তা, আধা শুকনো জামাকাপড়, চশমার কাচে মেঘলা আকাশ এলে ওই মেয়েটার মুখ ভেসে ওঠে। ওর বাবা দোকানে ব্যস্ত, বন্ধুবান্ধবদের আড্ডা থেকে দূরে, সাইকেলে বসিয়ে ঘুরেছে কতদিন। অভাবী ঘরের মেয়ের মুখে সারাক্ষন হাসি আর রোজ সন্ধ্যেবেলা হারমোনিয়াম নিয়ে কতক্ষন রেওয়াজ করে তার গল্প শোনায়। একদিন আস্তে আস্তে শোনাল 'জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে'। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, স্যাঁতস্যাঁতে সন্ধ্যেতে গানটাকে অধরা লাগছিল। মনে হচ্ছিল এ মুহুর্তটা বোধকরি কাল্পনিক। সময়টুকু কেটে গেলেই এর অস্ত্বিত্ব নেই। মনে, স্মৃতিতে কোথাও না।
‘আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া, তোমার বীণা হতে আসিল নাবিয়া’...
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল।
বর্ষাও তো শেষ হয়। দিন-কাল-মাস-স্বপ্ন-আশা-ইচ্ছা সবার শেষ আছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক থেমে গেছে, অনেকদিন। মন-স্মৃতি মাঠের কোণে ভিজে ঘাসে অযত্নে পড়ে থাকে। হস্টেলে গাঁজার প্রথম টানের পরে পুরো solar system যখন বনবন করে ঘোরে, মোবাইলে 'বাচনা আয় হাসিনো'র রিংটোন বাজলে মনে হয় টাটা ৪০৭-এর হর্ণ বাজল। হ্যালো বললে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, তার মাঝে কে যেন ওপ্রান্ত থেকে বলে, ‘জানো আজ আমায় দেখতে এসেছিল, খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে’
- বিয়ে, তো আমি কি করব?
লাইন কেটে যায়। ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাক থামায়।
ওভারটাইম কনভেন্সটা মারা গেল আজ। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়েছে। ৯ নম্বর মিটিং বা ডেটিং আজ। বাবার বন্ধুর মেয়ে। কথা বল, বুঝে নাও, পছন্দ হলে বোলো। MBA পড়ে মেয়ে, হেলাফেলা নয়। আগের আটটা বিকেল CCD, বারিস্তা, সিটি সেন্টার, INOX এর আনাচে-কানাচে ক্লান্ত হয়েছে। অনন্ত মিথ্যেভাষণ, বুঝে নেওয়ার অবুঝ প্রয়াসে। আজ লেকের ধারে আগাছার মাঝে একটু বসবার মত জায়গায়। বেশ চলছিল প্রোজেক্টের গল্প, হঠাত প্রশ্ন
- তুমি গান শিখেছ না?
- হ্যাঁ
- ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে' গানটা জানো?
- জানি
- গাও তো
'নীরব নিশি তব, চরণ নিছায়ে
আঁধার কেশ-ভার দিয়েছে বিছায়ে
আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া
তোমার বীণা হতে আসিল নাবিয়া
ভুবন মিলে যায় সুরের রণনে
গানের বেদনায় যাই যে হারায়ে.........'
সন্ধ্যে হয়, মেঘলা আকাশ, ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকে, মেয়েটি বলে কেমন লাগলো?
গাঁজা না খেলেও বোধ হয় কখন কখন এ বিশ্ব-ব্রম্ভান্ড ঘুরতে থাকে, আর বুকের মাঝে তার ভরকেন্দ্র। সেই কেন্দ্রে মাধ্যাকর্ষন তাকে টেনে রাখে, ছিটকে যেতে পারবে না তুমি। এ ঘুর্ণন, এই টান, তার মধ্যেই এই স্থির থাকার অভিনয় করে যাও, করে যেতেই হবে। হর্ণ বাজলো কোথাও, মাথায়, মাথার মধ্যে লক্ষ কোষ বিদ্রোহ করেছে একসাথে। ঘাসে চাপা স্মৃতিরা ঢুকে পড়েছে যে সেখানে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে সিগারেটের ধোঁয়ার মত। বেসামাল হয়ে হাত রাখে মেয়েটির হাতে। মেয়েটি চমকে যায়, ইষত লজ্জায় তার বুকে মেঘমল্লার, দীপক রাগ সে বোঝে না।
রাতে গা ম্যাজম্যাজ করে, সোঁদা গন্ধ আসে, ঘুমপাড়ানি বৃষ্টির শব্দেও ঘুম আসেনা। দোকানটা বহুদিন হল উঠে গেছে, তারা আছে কোথায়? কে জানে! খবর রাখেনি সে।
অভাবী ঘরের মেয়ে যদি অনেক অনেক দিন বাদে দেখে ছেলেটিকে তবে জয়ের কবিতা বাঙ্ময় হয় ‘জুড়িয়ে দিল চোখ আমার, পুড়িয়ে দিল চোখ’
এবার ঘুম আসে, ঠিকঠাক।