Menu

Jadavpur University Alumni Association Hyderabad Chapter

(JUAAH)

Blog Search

বাঁধ

সমিতা চক্রবর্তী

কারিগরী বিদ্যার পাঠক্রম শেষ করে, বহুতল নির্মান, বৈদ্যুতিক যোগাযোগ, খনি, তেল ইত্যাদি বিভিন্ন ঘাটের জল খেয়ে মধ্যবয়সে এসে ঠেকলাম বাঁধের ঘাটে। ছোটবেলায় মা-বাবার সাথে ভারতবর্ষের বেশ কয়েকটি বাঁধ পরিভ্রমণ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। তার মানে এই নয় যে আমার মা-বাবার এতই দূরদৃষ্টি ছিল যে, সেই শৈশবেই তাঁরা আমার ভাগ্যকে বাঁধের সাথে প্রায় বেঁধে ফেলেছিলেন। আসলে জাতীয় জলবিদ্যুৎ নিগমে কাজ করতেন আমার এক মামা। তাঁর আন্তরিক আতিথেয়তার সৌজন্যে আমাদের বিভিন্ন বাঁধ ভ্রমণ। কিন্তু তখন তো একমাত্র আগ্রহ ছিল বাঁধের উচ্চতায়। সেই দৈত্যাকার স্থাপত্যের আভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত তথ্য জানার বিন্দুমাত্র কৌতুহল তখন থাকলে আজ আমার যে কত উপকার হত!! জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে চাকরী করা তো দূরের কথা, চাকরীর দরখাস্ত করার কথাও মনে আনতাম না।

যাই হোক, আমার দুর্ভাগ্যের ফেরে আমাকে এখন একটি  ৬০ মিটার উঁচু বাঁধকে সামলাতে হচ্ছে। সামলানো না বলে, বাঁধতে হচ্ছে বলাই ভালো মনে হয়। বাঁধটি কিন্তু নতুন নয়, সে দিব্যি বহাল তবিয়তে আছে গত ৮০ বছর ধরে। হঠাৎ চারদিকে ভূমিকম্পের আক্রমণে আতঙ্কিত হয়ে প্রযুক্তিবিদ্‌দের মনে হল যে এই বৃদ্ধ বাঁধটিকে বেশ আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা দরকার। না হলে ধরিত্রী মায়ের নৃত্যের ছন্দে ছন্দ মেলাতে না পারলে তার পঞ্চত্ব প্রাপ্তির সম্ভাবনা প্রবল! উফ্‌ফ্‌, আগেই বলে দিলাম সম্ভাবনা প্রবল! আরে, এই সম্ভাবনা যে প্রবল, সেটা চূড়ান্ত করতে গত তিন বছর ধরে অন্তত ৬জন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং তিন জন বিশ্ববিখ্যাত অধ্যাপক তথা বিশেষজ্ঞের মাথার সমস্ত চুল অবলুপ্ত হয়েছে। দেশে শুনেছি অনেক ভক্তেরা তিরুপতির মন্দিরে চুল দান করেন ভগবানকে সন্তুষ্ট করতে। আমাদের এইসব উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্বরা তাঁদের চুলের বিনিময়ে যে কাকে সন্তুষ্ট করলেন ঠিক বলতে পারব না। তবে গত তিন বছরে তাঁদের চেহারার পরিবর্তন দেখে আমার বড়ই করুণা হয়েছিল। ভূমিকম্পের কম্পনমাত্রা  নির্ধারণ থেকে শুরু করে এই অশীতিপর বৃদ্ধ বাঁধের  শারীরিক ক্ষমতার বিচার করতে বেচারাদের নিজেদেরই অতি দুর্বিষহ অবস্থা হয়। তার ওপর আবার আমাদের ধরিত্রীমাতা তো তার নড়াচড়ার ব্যাপারটার কোনও পূর্বাভাস দেন না। তিনি উত্তর-দক্ষিণে নড়বেন, না পূর্ব-পশ্চিমে, না ওপর-নীচে সেটাও তো এই বিশেষজ্ঞদেরই অনুমান করে নিতে হয়। কাজ শুরু করার প্রথম দেড় বছরে তাদের মানসিক উদ্বেগের প্রতিফলন দেখলাম চুলের রঙের পরিবর্তনে। তারপর জটিলতা যত বাড়তে লাগল, চুল তত পাত্‌লা হতে লাগল। অবশেষে শেষ কয়েক গাছি চুলের বিনিময়ে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এই বাঁধটিকে ভূমিকম্পের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে মাটির নীচের নিরেট পাথরের সাথে শক্ত-পোক্তভাবে সংযুক্ত করতে হবে অর্থাৎ ইংরাজিতে যাকে বলে anchor করা।  কিন্তু কি ভাবে?

আমি যে এতদিন এইসব কাজের সাথে বিশেষ জড়িত ছিলাম না, সেটা আমার এক মাথা চুল দেখে যে কেউ বলতে পারবে। আর সেটাই হল কাল।   Departmental Meeting e সকলে মিলে একযোগে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই বাঁধ বাঁধার দায়িত্ব আমার ঘাড়ে দিল। মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ল! আমার দৌড় তো চুল বাঁধা পর্যন্তও না, বাঁধ বাঁধা তো দুঃস্বপ্ন!

এমতাবস্থায় এক মাথা চুল আর দুশ্চিন্তা নিয়ে গিয়েছিলাম LMBCS এর রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে। ভারী সুন্দর অনুষ্ঠান। মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখছি – বাঁধের কথা তো বেমালুম ভুলে গেছি দেখতে দেখতে।  কিন্তু অনুষ্ঠানের শেষে হল এক বিপত্তি। একদল নর্তকী একসাথে কবিগুরুর আহ্বানে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়ে বাঁধ ভাঙার ডাক দিল।

 শুরু হল ‘বাঁধ ভেঙ্গে দাও’ গানের সাথে নাচ। যখন আমি বাঁধকে বাঁধার উপায় নিয়ে বিপর্যস্ত, তখনই তাদের বাঁধ ভাঙার উদ্দীপনায় আমি তো স্তম্ভিত। তায় রবীন্দ্রনাথের গান! যার গান আমার প্রতি মুহূর্তের প্রেরণা আর তাঁরই গান কিনা আজ আমার বিষন্নতার কারণ! ভীষণ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কোন রকমে বাড়ি ফিরে সেদিন রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরবেলা স্বপ্ন দেখলাম লরি করে দলে দলে লোক আসছে বাঁধ ভাঙতে আর মাইকে বাজছে – ‘ভাঙো,  বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও…’।  ধর্‌ফর্‌ করে উঠে চান করে চুল আঁচড়াতে গিয়ে দেখি চিরুণীর সাথে উঠে এসেছে গোছা গোছা চুল।  ভেতর থেকে বেড়িয়ে এল গভীর দীর্ঘশ্বাস – আমার চুলও তাহলে রক্ষা পেল না।

Go Back

Comment

Protected by Mathcha