দেবাশিস বসু
রাজনৈতিক ডামাডোল আর চূড়ান্ত অব্যবস্থার মধ্যে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়ে ১৯৭১ সালে ভর্তি হলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিক্যাল এঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। দারুণ উত্তেজনা ছিল মনে, দুটো কারণ – প্রথম – ‘এঞ্জিনিয়ার’ হব বলে , আর দ্বিতীয় – জীবনে এই প্রথম ছেলে মেয়ে একসাথে পড়ব বলে। কোন কারণে উত্তেজনা বেশি?
যাক সে কথা!
সেই সময়ে এঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক হতে পাঁচ বছর লাগত। প্রথম দুবছর হরেক রকম বিষয় পড়তে হত, যার সঙ্গে এঞ্জিনিয়ারিং এর সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। তাই এই দুই বছর কেটেছে মজায়, কারন পড়াশুনো কম, অন্যকিছু বেশি, যেমন -ক্যান্টিনে আড্ডা, ঘন ঘন খাল পার হওয়া, নবীনা সিনেমায় ৬৫ পয়সায় টিকিটের লাইন দেওয়া, মোহনবাগানের খেলা দেখতে যাওয়া (যদিও আমি বাঙ্গাল)। এছাড়া ফোটোগ্রাফি ক্লাবে যেতাম নিজে ছবি প্রিন্ট করতে। একটা ভাল ছবি প্রিন্ট করতে খুব মনঃসংযোগ করতে হয়, তাই শিখতেও খুব ভাল লেগেছিল।
পরের তিন বছর খুব কষ্টে কেটেছে, কারণ পড়াশুনো করতে হত। তাও সবাই মিলে একসাথে ক্লাস বয়কট করতাম কারণ- আকাশে মেঘ করলে, কলে জল না থাকলে, গাভাস্কার সেঞ্চুরি করলে। তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এঞ্জিনিয়ার হলাম। আর ছেলেমেয়ে একসাথে পড়ে কি হল? যাক সে কথা...
সেই পাঁচটা বছর কি ফিরে পাওয়া যায়? জানি যায় না। তাই খুব ইচ্ছে যে পরের জন্মে যেন জাতিস্মর হয়ে জন্মাই। আবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব আর এবার দ্বিতীয় ইচ্ছেটাও পুরণ করব।
ষোল বছর কোলকাতায় চাকরি করে হায়দ্রাবাদে এলাম আর তারও প্রায় দশ বছর পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ হল। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা আর এখন সম্পর্কের নিবিড়তা। খুব ভাল সময় কাটে এদের সঙ্গে, নির্ভেজাল আনন্দ পাই। এই সংগঠনের চরিত্রটা অন্য অনেক সংগঠনের থেকে বোধ হয় একটু আলাদা আর তেমনটাই যেন থাকে, যেমন - সম্পর্কের সমানতা, বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য ছোটোদের সম্মান, ছোটোদের জন্য বড়দের অনেক শুভেছা, ভালবাসা, রুচিপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরী করে আনন্দ পাওয়া আর আনন্দ দেওয়া আর অভাবী ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করার মত ভাল ভাল কাজ করা, প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
এটা লিখতে লিখতে হঠাৎ ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু কেন? অনেকক্ষণ ভাবার পর মনে হল, এই কারণে নয় তো?
“যদি চাকরি জীবনের শেষে হায়দ্রাবাদ ছেড়ে চলে যেতে হয়, কি হবে?” মন ভারী অদ্ভুত, সেটা নিয়ে ভাবতে নেই। আমার মন, না মনের আমি? যাক সে কথা...