দোয়েলী চক্রবর্তী

ট্রেকিং-টা আমার ছোট বেলা থেকেই খুব ভাল লাগত। বাবাকে দেখতাম মনিমহেশ, অমরনাথ, ছাঙ্গু, গোমুখ যাচ্ছে বন্ধুদের সাথে। আমি আর মা বাদ। তবু সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতাম কবে বাবা ফিরবে আর ওইসব রোমাঞ্চকর ঘটনার বিবরণ শুনব। ধীরে ধীরে ট্রেকিং-এর ইচ্ছেটা মনের মাঝে উঁকি দিতে লাগল। বিয়ের পর তাই অনেক ঘুরলেও সেই রোমাঞ্চটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলামনা। সাহস করে তাই একদিন সৌমিককে বলে ফেললাম – “যাবে? পাহাড়ের কোলে পায়ে হেঁটে? ভাল না লাগলে আর কোনোদিন যাব না”। সৌমিক খুব আগ্রহ দেখাতে শুরু হয়ে গেল প্লানিং। ইন্টারনেট থেকে জানতে পারলাম রূপকুন্ডের কথা। নন্দাদেবীর কোলে ১৬,০০০ ফুট উচ্চতায় একটা লেক যাকে ঘিরে অনেক রহস্য। সামান্য একটা লেক কে ঘিরে এত রহস্য কেন? কিছুদিন পড়াশুনা করে জানতে পারলাম লেকের আশেপাশে নাকি ছড়িয়ে আছে অনেক নরকঙ্কাল। প্রায় ৪০০-৫০০ মানুষের করোটি ও দেহাবশেষ। শুনেই গায়ে কাঁটা দিল, তাহলে তো যেতেই হবে।
দিন ঠিক হল ২৮ মে ট্রেকিং শুরু হবে। যাত্রাপথের বিবরণ শুনে নিজেদের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম ছমাস আগে থেকে। ২৫ মে হায়দ্রাবাদ থেকে ট্রেনে দিল্লি। পরেরদিন দিল্লি পৌঁছে রাতের রানীক্ষেত এক্সপ্রেস, পৌঁছে গেলাম কাঠগোদাম। আগে থেকেই আমাদের ট্রেকিং এজেন্সির মাধ্যমে গাড়ি ঠিক করা ছিল। গাড়ির মাথায় মালপত্র তুলে রওনা দিলাম বেস ক্যাম্প এর উদ্দেশ্যে। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ি নদীকে সাথে নিয়ে আঁকাবাঁকা পথে চলতে লাগল আমাদের গাড়ি। দিনের শেষে পৌঁছে গেলাম প্রত্যন্ত এক পাহাড়ি গ্রাম লোহারজং। উচ্চতা ৮৫০০ ফুট। জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে। এখানেই আমাদের বেস ক্যাম্প।
পরেরদিন সকালে ট্রেকিং এর সরঞ্জাম, আগামী দশ দিনের খাবার দাবার, বাসনপত্র, তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ, আপতকালীন ওষুধপত্র ক্যামেরা ইত্যাদি পিঠে নিয়ে শুরু হল হাটা। কিন্তু প্রথম দিনেই বিপত্তি। আমরা পূর্ব-নির্ধারিত পথে না গিয়ে চলেছি অন্য রাস্তায়। প্রতিবার ভাবছি একটু এগোলেই বাকি দের দেখতে পাব, কিন্তু নাহ, প্রতি বাঁকের পরে শুন্য আর এক বাঁক। হঠাৎ কিছু মানুষের আওয়াজ পেলাম মনে হল। খাদের কিনারায় এসে ঝুঁকে দেখি অনেক নিচে জঙ্গলের রাস্তায় আমাদের সঙ্গীরা যাচ্ছে সার বেঁধে। মাথায় হাত! আমরা তাহলে পথ ভুলে চলে এসেছি এত উপরে! কি করে যাব এবার অত নিচে! এতক্ষণে দুঘণ্টা হাঁটা হয়ে গেছে। তাই ফিরে এলাম বেস ক্যাম্পে। কিন্তু কপালজোরে পেয়ে গেলাম গ্রুপের ‘সুইপার’ কে। ট্রেক এ ‘সুইপার’ হল সেই যে সব থেকে শেষে যায় আর দেখে আমাদের মতো কেউ পিছিয়ে পরেছে কিনা। যাইহোক সেই দিন অনেক ছড়াই উৎরাই পেরিয়ে নির্ধারিত সময়ের ১ ঘণ্টা পরে পৌছলাম পরের ক্যাম্প দিদিনা তে। সেদিনের মতো তাঁবু ফেলা হল দিদিনাতে।
পরের দিনটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা দিনগুলোর একটা। আজকের রাস্তা প্রানান্তকর চড়াই রডোডেন্ড্রন বনের মধ্যে্রানান্তকর চড়াই রডোডেন্ড্রন দিয়ে। কিন্তু ফুলের বাহার পাখির ডাক লাঘব করে দেয় সব শারীরিক কষ্ট। চড়াই শেষে বনও শেষ আর চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেল বুগিয়ালের অপার সৌন্দর্য। নাম আলি বুগিয়াল, উচ্চতা ১২০০০ ফুট। ‘বুগিয়াল’ কথার অর্থ অধিক উচ্চতায় অবস্থিত সমতল ঘাসের ভুমি। এমন দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ দেখে অবাক হয়ে গেলাম। মনে হল খালি পায়ে একটু হেটেনি। কিন্তু অত উচ্চতায় আর ঠাণ্ডায় এসবের স্বাধীনতা নেই। তাই নরম ঘাসে একটু জিরিয়ে নিলাম। ক্লান্তি কাটিয়ে আবার চলা শুরু। দিগন্তের কিনারে আমাদের আজকের আস্তানা বেদনী বুগিয়াল। পাহাড়ের হাল্কা ঢাল বেয়ে উঠে এলাম বেদনী ক্যাম্প এ। উচ্চতা প্রায় ১২৫০০ ফুট। রাতে এমন ঝোড়ো হাওয়া শুরু হল মনে হচ্ছিলো এই বুঝি তাঁবু সমেত উড়ে যাব। এক তাঁবুতে চাপাচাপি করে ছজন কোনমতে, হাওয়ার দমকে তাঁবু দুলছে। তাঁবু আঁকড়ে বসে রাত কাটালাম। রাতে খাওয়া আর হল না, শুকনো কিছু খাবার খেয়ে রাত কাটালাম। কখন তন্দ্রা এসে গেছে জানিনা। ভোরবেলা শুনতে পেলাম কোথা থেকে যেন রবীন্দ্র সংগীত ভেসে আসছে। দুর্গম হিমালয়ের বুকে যেখানে মানব সভ্যতার চিহ্নমাত্র নেই, ভুল শুনছি ভেবে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে দেখি আমাদের পাশেই এক দলের তাঁবু পরেছে। গান চালিয়ে তাদের চা জলখাবারের প্রস্তুতি চলছে। আলাপ করে জানতে পারলাম তাঁরা এসেছেন মালদা থেকে। গতকাল রূপকুন্ড জয় করে গভীর রাতে নেমে এসে আমাদের পাশে তাঁবু ফেলেছেন। এত দুর্যোগে সামিট!! তাদের বিবরণ শুনে বুঝলাম সামনে কঠিন পরীক্ষা। মন শক্ত করতে হবে। তাঁরা যদিও আমাদের খুব আশা দেখালেন। আমরা আস্তানা গুটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
এবার পথ যেমন সরু তেমনি খাড়াই। সামনে আর আমাদের জরুরী জিনিষ ছাড়া আর কিছু নিয়ে যাওয়া যাবে না। তাই পিঠের ওজন কমিয়ে এগিয়ে চললাম অতি সন্তর্পণে। প্রায় চার ঘণ্টা খাড়া চড়াই বেয়ে উঠে এলাম ‘কালু বিনায়াক’। উচ্চতা প্রায় ১৪০০০ ফুট। কালো পাথরের গণেশ মূর্তি পাথরের বেদীতে। এ পথে একবার মাথা ঠেকিয়ে যাওয়া আর কি। সামনের বিপদ সঙ্কুলান পথের জন্য আশীর্বাদ চেয়ে এগিয়ে গেলাম। এর পর থেকে শুধুই পাথর আর বরফ। যাকে বলে ‘মোরেন’, যেটা ট্রেকিং এ সব চেয়ে কঠিন আর বিপদজনক রাস্তা। ইতিমধ্যে আমরা ট্রি লাইন ছেড়ে স্নো লাইন-এ প্রবেশ করে গিয়েছি। আরও দুঘণ্টা চলার পর পৌঁছলাম আমাদের সামিট ক্যাম্প ‘বগুয়াবাসা’। উচ্চতা ১৪,৮০০ ফুট। এত উচ্চতায় একরাত কাটানোই মুশকিল। বাতাসে অক্সিজেন এর কমতি বেশ ভাল বোঝা যাচ্ছে, সবাই অল্প বিস্তর মাথা যন্ত্রণাতে কাবু। আর তাঁবুতেও আরাম নেই এবারে। পাথর আর বরফের মাঝে একটুও সমতল জায়গা নেই যেখানে ভাল ভাবে তাঁবু ফেলা যায়। যাইহোক তাঁবুতে শুয়ে দেখি পিঠে পাথরের খোঁচা লাগছে। ধুস এই ভাবে ঘুম হয়? তার উপর আবার কালকের সামিট এর চিন্তা। কিন্তু হঠাৎ সব ভুলিয়ে দিল চোখ ধাঁধানো সোনালি আলো যা ত্রিশূল পিক এর মাথায় ঠিকরে আমাদের চোখে পরেছে। এমন সূর্যাস্ত জীবনে আর কোনোদিন দেখব বলে মনে হয়না! মন ভাল হয়ে গেল। শরীরেও যেন বল ফিরে পেলাম। কাল ভোর ৪ তে শুরু হবে আমাদের সামিট অভিযান। সামিট এর পর সেইদিনেই নেমে যাব আবার বেদনি বুগিয়াল। বরফ গলিয়ে খাবার জল বানিয়ে ম্যাগি দিয়ে ডিনার সেরে সন্ধ্যে ৭ টার মধ্যে শুয়ে পড়লাম।
ভোর সাড়ে ৩ টেয় উঠে ফ্রেশ হয়ে ফেদার জ্যাকেট আর ‘গেইটার’ পরে নিলাম। ‘গেইটার’ হল জুতোর ওপর একপ্রকার সিনথেটিক আবরণ যাতে জুতোয় বরফ বা জল ঢুকে না যায়। তার উপর জুতোর নিচে পরে নিলাম ‘ক্র্যাম্পন’ বা এক ধরনের জুতোর কাঁটা যা বরফের খাড়া ঢালে পা পিছলে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। মাথায় হেড-টর্চ লাগিয়ে ডালিয়ার খিচুড়ি খেয়ে শুরু হল যাত্রা। খুব সাবধানে অন্ধকারের মধ্যে চলেছি সার বেঁধে। পাহাড়ের ঢাল বরাবর আড়াআড়ি প্রায় ২ ঘণ্টা হেটে পৌঁছলাম একটা খাড়া বরফের দেওয়ালের সামনে। এই জায়গার নাম ‘চিড়া নাগ’। প্রায় ৩০ ফুট উঁচু দেওয়াল যেন ক্রুদ্ধ সাপের ফণার মতই আমাদের পথ আটকে রয়েছে। ট্রেক লিডারের নির্দেশে লাগানো হল দড়ি। খাঁজে পা রেখে উঠতে গিয়ে এক সহযাত্রীর নাক ফাটলো, আর এক জন পা পিছলে খাদে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল দড়ির দাক্ষিন্যে। আজ একটুও অসাবধানতা চলবে না। তাই আমরা অতি সন্তর্পনে দড়ি বেয়ে এক পা এক পা করে উঠে এলাম খাড়া দেওয়ালের মাথায়। তখন সবে ভোরের আলো তখন ফুটছে। রোদ উঠলেই বরফ গলতে থাকবে তখন হাঁটা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সময় নষ্ট না করে এগিয়ে চললাম। প্রানান্তকর চড়াই আজ। শরীরটাকে টেনে টেনে যেন তুলছি আর হাপরের মতো নিঃশ্বাস নিচ্ছি। বরফের ঢালে কোনমতে দাঁড়িয়ে পিঠের ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে খেতে গিয়ে দেখি সে তো কখন জমে বরফ! কিন্তু ত্রিশূলের অপরূপ শোভা র রূপকুন্ডের হাতছানি বোধহয় আমাদের অতিমানবিক শক্তি জোগাতে লাগল। শেষ ৩০ ফুট চড়াই ভাঙ্গতে সময় লাগল ১ ঘন্টা। কারণ প্রায় প্রতি পদক্ষেপে দাড়াতে হচ্ছিলো। অবশেষে দেখা মিলল বহু প্রতিক্ষিত রূপকুন্ডের। সময় তখন সকাল ১০ টা। ডিজিটাল অল্টিমিটার বলছে উচ্চতা ১৬,০০০ ফুট। বাতাসে অক্সিজেন খুব কম, শুধু বসে থাকলেই হাঁপ ধরে যায়। নন্দাদেবী পর্বতে ত্রিশূল শৃঙ্গের পাদদেশে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট এই লেক যার জন্যই এত কষ্ট। আমরা তাহলে পেরেছি! চোখে জল এসে গেল।িটা কড়রতিরে যায়।থাুন্ডের ইতিহাস মন ভরে গেল রূপকুন্ডের শোভা দেখে। হিমালয়ের উজাড় করা সৌন্দর্য দেখে ক্ষনিকের জন্য ভুলে গেছিলাম মনোরম দৃশ্যগুলকে ক্যামেরাবন্দি করতে। কিছুক্ষন বিশ্রামের জন্য রূপকুন্ডের পাশে বসে সাথে আনা প্যাকড লাঞ্চ খেতে খেতে যেন হারিয়ে গেলাম বেস ক্যাম্পে বসে আমাদের হাই-অল্টিটিউট ট্রেক লিডার অয়ন-দার মুখে শোনা রূপকুন্ডের ইতিহাসে। আজ থেকে ৫০০ বছর আগে স্থানীয় মানুষের (বা কেউ কেউ বলে মঙ্গোলীয়) একটা দল এসেছিল ভেট নিয়ে নন্দাদেবীকে পুজো দিতে। পূজারীর আদেশ অগ্রাহ্য করে সেই দলে এসেছিলেন এক সন্তান-সম্ভবা নারী। নন্দাদেবীর রোষে তাই হঠাৎ শুরু হয় শিলা বৃষ্টি। রূপকুন্ডের পাশে খোলা আকাশের নিচে অসহায় ভাবে মৃত্যু হয় সবার। গল্প সত্যি মিথ্যে যাই হোক না কেন, চোখের সামনে দেখা সেই দেহাবশেষ তো মিথ্যে নয়।
হয়তো রূপকুন্ডের ইতিহাস দুঃখের, পৌঁছনোর রাস্তাতেও কষ্ট অনেক, তবু এই মৃতদেহের ভিড়ে কোথাও মিশে আছে জীবনের নতুন মানে। এতটা পথ হেঁটে , প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যে বিলীন হয়ে যেতে যেতে, এই মৃত্যু-ইতিহাসের মাঝেও খুঁজে পাই অজানা হৃদস্পন্দন। বরফঢাকা রূপকুন্ডের সামনে দাঁড়িয়ে, ত্রিশূল পাহাড়কে সাক্ষী রেখে বলি
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ
নাহি নাহি দৈন্য লেশ
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে