Menu

Jadavpur University Alumni Association Hyderabad Chapter

(JUAAH)

Blog Search

সাহারার পাখি

বেদদ্যুতি চক্রবর্তী

জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতাগুলো আবিষ্কারের আনন্দের মতন ! প্রথম দেখা ইস্টাবেঙ্গল মাঠ, প্রথম মেট্রোরেলে চড়া, প্রথম সমুদ্রে স্নান...! আর, প্রথম এরোপ্লেনে ওড়া। নিজামের হায়দ্রাবাদ থেকে জোব চার্নকের কোলকাতা। দেড় হাজার কিলোমিটার পেরোতে ট্রেনে লাগে প্রায় তিরিশ ঘণ্টা। আর ‘সাহারা’র পাখির ডানায় ভর করে এলে মোট দু’ঘন্টা ! সেই স্বপ্নসুযোগ এসে গেল কোলকাতার এক প্রাইভেট কোম্পানিতে ইন্টারভিউ- এর দৌলতে । তাড়াতাড়ি স্নান সেরে ঘন্টাখানেক আগেই প্লেনের ইস্টেশানে চলে এলাম । ৬ই ডিসেম্বর, ২০০২ । হাসিমুখের বিমাণসেবিকাকে টিকিট দেখাতেই পেলাম সুন্দর কাগজের বাক্স ভর্তি লজেন্স। এদিকে আমার কাঁধের ব্যাগ ঢুকে গেল কালো একটা চেম্বারে। সেখানে যন্ত্রের চোখ আঁতিপাঁতি করে খোঁজার চেষ্টা করল বিস্ফোরক-জাতীয় কোণ অপদ্রব্যকে। লাভ হল না। ব্যাগ পরীক্ষায় পাশ করল। আমি চলে এলাম সাময়িক বসার জায়গা, লাঊঞ্জে। মাইকে ঘোষণা হল – কোলকাতা গামী ‘সাহারা’র বিমানযাত্রীদের এরোপ্লেনের দিকে এগিয়ে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। আবার চেকিং। ‘সাহারা’র সেবকেরা হাতে দস্তানা পরে আমাদের পোশাক আশাকে হাত বুলিয়ে কিছু খোঁজার চেষ্টা করল। এজন্য দস্তানা কেন? উত্তর পেলাম – ‘স্যার, আপনাদের জামাকাপড় যাতে নোংরা না হয়...!’ ইচ্ছে ছিল সিমেন্ট-বাঁধানো শানের মধ্যে দিয়ে হেঁটেই গিয়ে উঠব স্বপ্নের আকাশযানে। ঐ তো, কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। ‘বোয়িং 737-700’ ‘সাহারা’র পাখি। নিরাপত্তারক্ষীদের আদেশে আমার হেঁটে যাওয়া আর হল না। অগত্যা ৩০ সেকেন্ডের বাসযাত্রায় পৌঁছে গেলাম একদম এরোপ্লেনের সামনে। ক্যাপ্টেন স্বয়ং আপ্যায়ন করে প্লেনের ভেতরে ঢোকাচ্ছেন। সবার মুখে সেই হাসি, তাতে পেশাদারিত্বের সাথে হৃদয়ের ছোঁয়াও আছে। লাঊঞ্জে ঢোকার সময় বিমান সেবিকাকে অনুরোধ করেছিলাম, প্রথম প্লেনে চড়ব – জানলার ধারে যদি...! প্লেনে উঠেই দেখি ইচ্ছেপুরণ। জানলার ধারে আমার সীট! একটু পরেই শুরু হবে স্বপ্নের যাত্রা। পাশের ভদ্রলোক সমানে আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছেন। আমার ভাল্লাগছে না। মনভরে ধরে রাখার চেষ্টা করছি, চোখ দিয়ে নিমেষে তুলতে থাকা অজস্র ছবিকে। বেল্ট বাঁধার আদেশ হল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বিমান চলতে শুরু করল। দু’মিনিট চলে হঠাৎ চুপ। তারপর ছোট্ট বাঁক নিয়েই ছুট। ছুট মানে হু-হু করে... গোঁ-ও-ও শব্দ করতে করতে...। বাপরে আরও জোরে...। হঠাৎ দেখি আমি মাটির সাথে ৩০ ডিগ্রি কোণ করে ওপরে উঠে যাচ্ছি। উত্তেজনার সাথে কেমন ভয় করতে লাগল। ‘সাহারা’ মানে তো ভরসা…। তাহলে ভয় কেন? দেখতে দেখতে একতলা – দোতলা – পাঁচতলা দশতলা বাড়ীর চেয়েও ওপরে… ট্রান্সমিটার, অ্যান্টেনা, নারকেল গাছ ছাড়িয়ে… আরও ওপরে…উঠে গেল এরোপ্লেন। কাঁচের জানলার মধ্যে দিয়ে দেখছি প্লেনের ডানাটাও অল্প-অল্প ওপর- নিচে হেলছে, দুলছে। ভেসে এল কয়েকটা শব্দ। বাংলা করলে যা দাঁড়ায়  “ আমাদের প্লেন এখন ৩৩ হাজার ফুট উঁচুতে, বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।”  সাধারন তুলনা মনে এল। আমরা তাহলে এভারেস্টের (প্রায় ২৯ হাজার ফুট যার উচ্চতা) চেয়েও উঁচুতে আর কারগিলের রোজকার তাপমাত্রার আধারে ? অথচ প্লেনের ভেতর সবই স্বাভাবিক রকমের। হঠাৎ মনে হল প্লেনটা যেন পড়ে যাচ্ছে। ভারশূন্যভাবে। মেলায় নাগরদোলা থেকে নামার সময় যেমন ফাঁকা ফাঁকা একটা ধড়ফড়ানি লাগে। প্রানপণে চেপে ধরলাম চেয়ারের হাতলদুটো। মমতাময়ী লালপেড়ে শাড়ি-পরা বিমানসেবিকারা সদাই ব্যাগ্র। আমার করুণ অবস্থা দেখে এগিয়ে এসে বলল ‘Any help?’ মনে মনে বলি -  ‘পারবে তুমি আমাকে এখন মাটিতে নামিয়ে দিতে?’ বলিনি কিছু, একটু হেসেছি। আবার প্লেনটা ওপরে উঠছে। এবার বুঝতে পারলাম এভাবে হাওয়া কেটে, উপর-নীচ করে এগিয়ে যাওয়াটা সাধারন ব্যাপার। ওড়ার সময় জানলা দিয়ে স্পষ্ট দেখেছিলাম নীচের রেল লাইন, ঘরবাড়ী, পাহাড়ের চুড়া। এখনও কত ফাঁকা জায়গা আমাদের পৃথিবীতে! তবে, পৃথিবীটা অনেক ভাগ-ভাগ। খালি সীমানা। জমির সীমানা, আল, পাঁচিল। দুরের দ্বিগন্তরেখা কালো রঙ্গে মিলে আবার ঝলসে ওঠে (পেছনের সূর্যের আলোতে) নীলে মিলিয়ে গেছে। ওপর থেকে ঢিবি ঢিবি পাহাড়গুলোকে দেখে ওগুলো যে কত উঁচু সেটা ধারনা করা সম্ভব হল না। শরবৎ, লজেন্স, দুপুরের গরম খাবার, চা, কফি সবই এল। একটা প্লাস্টিকের মোড়কে পেলাম সুন্দর-সুন্দর চারটে চামচ। সযত্নে বুকপকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম (কেউ যেন দেখতে না পায় এইভাবে)। লজেন্সও একটাও খাইনি। বিমানসেবক হর্ষের সাথে কথা বলে জানলাম, প্লেন এখনই ভুবনেশ্বর-কটকের ওপর দিয়ে সমুদ্রে ঢুকবে। সেবিকারা দেখিয়ে দিলেন – অবস্থাবিশেষে যদি প্লেন সমুদ্রে পড়ে যায় কীভাবে ‘সেফটি জ্যাকেট’ বেঁধে বাঁচতে হবে । আবার  উৎকণ্ঠা ! সত্যিই কী সেরকম কিছু ঘটার সম্ভাবনা আছে? হর্ষের কথায় আশ্বাস পেলাম – ‘এটা রুটিন সতর্কতা’। জানলা দিয়ে নিচে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলাম – মোহনা । মনেহয় – ঐ নদীটাই মহানদী। সমুদ্রের রং প্রথমে সোনালী। জলের অগভীর তলায় বালির জন্যে। তারপরই তা হঠাৎ নীল হয়ে গেল। কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। জলের মধ্যে প্লেনটা পড়লে অন্ততঃ বেঁচে যাব। বেশী লাগবে না। অল্পসল্প সাঁতারও জানি। ঘোষণা হল আর কুড়ি মিনিটের মধ্যেই নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বিমান আড্ডায় মানে দমদমে, পৌঁছে যাবে এরোপ্লন। আরে, প্লেনের বাথরুমটাতো তখনও দেখা হয়নি। আমার কিছুই পায়নি, তবু গেলাম। আকাশে ব্যাপারটা কেমন করে হয় সেটাই দেখতে। আরে বাবা দুফুট বাই আড়াইফুট বাই সাড়ে ছ’ফুট জায়গার মধ্যে স্নান,  পায়খানা, সাবান, গরমজল, ঠাণ্ডাজল সবই আছে। সুন্দরভাবে। আমাদের ঘরের বাথরুমগুলো এত ঢাউশমার্কা বড় করার দরকার কী কে জানে। বু্কপকেটে একটা কম্পাস ছিল। মাঝে মাঝেই ওটা বার করে মিলিয়ে দেখছিলাম – প্লেনটা কোনদিকে যাচ্ছে। বাথরূম দর্শন করে আবার সীটে ফিরে এলাম।

সীটবেল্ট বাঁধার সতর্কবাণী এল। স্পষ্ট বুঝতে পারছি মাটির আরও কাছাকাছি আসছি। কাছে...আরও কাছে। প্লেন কিন্তূ এগিয়েই চলেছে। চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠছে কোলকাতার বাড়ী-ঘরদোর, ট্রাক, ট্যাক্সি, স্কুটার। ছাদের ওপর লাল নীল শাড়ী, সালোয়ার অ্যান্টেনা-বুস্টার।

একটা ঘষা খাবার বিরাট আওয়াজ... দেখলাম রানওয়ে দিয়ে মাটি ছুঁয়ে প্লেন এগিয়ে চলেছে... গতি কমল... আস্তে আস্তে... থেমে গেল ‘সাহারা’র পাখি। সাময়িক তার বিশ্রাম। আরেকটা উড়ানের আগে।

আমার জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা শেষ হল। জীবনে প্রথম প্লেনে চড়া, মনে থাকবে চিরদিন।

(জীবনে প্রথম এরোপ্লেনে চড়ার আনন্দে লেখা । যখন লেখাটা লিখেছিলাম itsbeda@rediffmail.com  এখনঃ iambeda@gmail.com)

Go Back

Comment

Protected by Mathcha